,

ইসলামপন্থী দলগুলোতে মতপার্থক্য ‘বৈষয়িক, ধর্মীয় নয়’

ঢাকা অফিস: বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমপর্যায়ের ডিগ্রি হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যেই এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। আহলে সুন্নত নামের একটি সংগঠন বলছে, দেশের সব মাদ্রাসায় একই ধরনের পাঠ্যক্রম অনুসরণ না হলে কোরআন ও হাদিসের ভিন্ন ব্যাখ্যার আশংকা থাকে। তবেমাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম নিয়ে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্ক নতুন কোন বিষয় নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কওমি শিক্ষা নিয়ে হালের মতপার্থক্য বৈষয়িক, ধর্মীয় নয়।

এদের মধ্যে নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীও বেশ স্পষ্ট। সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমপর্যায়ের ডিগ্রি হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেয়ার পর মতপার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়েছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত নামের একটি সংগঠন মনে করে, দেশের সব মাদ্রাসায় একই ধরনের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা জরুরি। দেশের আলিয়া মাদ্রাসায় যারা পড়াশুনা করেন তাদের একাংশ এই সংগঠনের সাথে জড়িত।

এসব মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম সরকার কর্তৃক স্বীকৃত এবং তাদের শিক্ষক নিয়োগে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসাগুলো তার বিপরীত। দেশের সব মাদ্রাসায় অভিন্ন পাঠ্যক্রম চালু না হলে কোরআন ও হাদিসের ভিন্ন-ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে বলে আশংকা করেন আহলে সুন্নতের প্রধান সমন্বয়ক মাওলানা এম এ মতিন।

তিনি বলেন, ‘তাদেরকে (কওমি মাদ্রাসা) প্রশ্ন করেন তো আলিয়া মাদ্রাসায় যে কোরআন ও হাদিস পড়ানো হচ্ছে, সেটা পড়তে আপনাদের ভয় কোথায়? ওরা কেন এটা পড়বে না?’

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়াশুনা করে এবং যারা পরিচালনা করে তাদের বেশিরভাগ ইসলামপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত। উভয় পক্ষ নিজেদের ইসলামের পক্ষে বড় শক্তি হিসেবে দাবি করে। তবে হেফাজতে ইসলামীর নেতারা আহলে সুন্নতকে স্বীকার করতেই রাজি নয়।

হেফাজতে ইসলামীর অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি মুফতি ফয়জুল্লাহ’র কথায় সে বিষয়টি স্পষ্ট: ‘কাদের কথা বলছেন, আমি আসলে ওদের চিনি না, জানি না।’

তার ভাষায়, ‘প্রকৃত ইসলামী শক্তি যদি মান অর্জন করে, দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করে এবং দেশের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিছু মানুষ সবসময় এটার বিরোধিতা করতেই থাকে।’ তিনি মনে করেন, সরকারি স্বীকৃতির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মাওলানা মফয়জুল্লাহ বলেন, ইসলামের মূল শিক্ষা, দর্শন এবং জীবনাদর্শকে কেন্দ্র করেই কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালনা করা হয়। সেজন্য বিষয়টি নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ দেখছেন না তিনি। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন যে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সরকার কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে উভয়পক্ষ।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ মনে করেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ার এই ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে সেটি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে বলে মনে অধ্যাপক রশীদ।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবিতে মাস্টার্সের যে ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে ঠিক একই সমমানের হবে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রি। তিনি বলেন, আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের মাস্টার্সের সমপর্যায়ের ডিগ্রি নিতে প্রায় ১৫ বছর সময় লাগে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রি নিতে ১০ বছরের মতো সময় লাগে। তবে কোরআন ও হাদিসের ভিন্ন-ভিন্ন ব্যাখ্যার যে আশংকা আহলে সুন্নত করছে, সেটির সাথে একমত নন অধ্যাপক রশীদ।

অধ্যাপক রশীদ প্রশ্ন তোলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স ডিগ্রি কোন্‌ বিশ্ববিদ্যালয় দেবে? কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কোন কর্তৃপক্ষ হতে পারে না। তিনি আশা করেন, যেহেতু কওমি মাদ্রাসাগুলো এখন সরকারি স্বীকৃতির আওতায় এসেছে সেজন্য ধীরে-ধীরে হয়তো সরকারি নীতিমালা হবে এবং তারা যথাযথ ডিগ্রি পাবে।

কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো যেভাবে একে অপরের বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়ছে সেটি নিরসন হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘দেখা যাচ্ছে কেউ কারো রাজনৈতিক হাতিয়ার হচ্ছেন বা কেউ তার নিজের পরিচয়টাকে জাতীয় বা ধর্মীয় স্বার্থের চাইতেও বড় করে দেখছেন। আর্থিক লাভ-অলাভ, রাজনৈতিক সুবিধা, পাওয়া কী না পাওয়া- এসব বিষয়গুলো তো বিরোধিতার কারণ হিসেবে রয়েছে। বিষয়টা যতটা না ধর্মতাত্ত্বিক তার চেয়ে বেশি বৈষয়িক।’

আবার হেফাজতে ইসলাম এবং আহলে সুন্নতের নেতারা বলছেন, ইসলামের মূল বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মাঝে কোন মতপার্থক্য নেই। কিছু শাখা-প্রশাখা নিয়ে মতপার্থক্য আছে।

মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘এ জিনিসটাকে খুব বড় করে দেখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে কারি না। আপনি চিটাগাং থেকে ঢাকা আসবেন। আপনি ফ্লাইটে আসবেন নাকি বাই রোডে (সড়ক পথে) আসবেন অথবা ট্রেনে আসবেন- সেটা আপনার বিষয়। এ ধরনের কিছু বিষয় নিয়ে আমি মনে করি যে কিছু বিরোধ থাকতে পারে যে আপনি কোন পথে চলবেন।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category