,

পুলিশের হয়রানি থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার চেষ্টা

যশোর প্রতিনিধি: যশোরে পুলিশের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন এক অন্তঃসত্ত্বা নারী। সোমবার সদর উপজেলার বড় শেখহাটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার শিকার সাবিনা ইয়াসমিন (৩২) ওই গ্রামের আব্দুল গফুরের স্ত্রী। অসুস্থ অবস্থায় তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সাবিনা ইয়াসমিনের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তার স্বামী আব্দুল গফুরকে মাদক মামলায় আটক করে অন্তত ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যশোর ডিবি পুলিশের এএসআই আলমগীর হোসেন ও কোতোয়ালি থানার এসআই বিপ্লব। পুলিশের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেও মুক্তি মেলেনি তার।

গত ২৫ মার্চ ৫ হাজার পিস ইয়াবা দিয়ে পুলিশ তাকে আটক দেখিয়েছে। এরপর এএসআই আলমগীরের নজর পড়ে সাবিনা ইয়াসমিনের উপর। একের পর এক অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের হুমকি দেয়ায় গত ২৮ মার্চ সাবিনা এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করেন।

এই আবেদনে ক্ষুব্ধ হয়ে রবিবার মধ্যরাতে সাবিনার বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে সোমবার সকালে বিষপান করেন তিনি। এ সময় প্রতিবেশিরা টের পেয়ে তাকে উদ্ধার করে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে সাবিনা ইয়াসমিন জানান, বছরখানেক আগে কুসঙ্গে পড়ে তার স্বামী আব্দুল গফুর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। এ সময় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এএসআই আলমগীর তাকে বেশ কয়েক বার আটক করেন। প্রতিবারই ২০/৩০ হাজার টাকা নিয়ে পেইন্ডিং মামলায় চালান দেন। এইভাবে তার নামে ৫টি মামলা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে তাকে বাঁচাতে তিনি ও আত্মীয়-স্বজন মিলে আব্দুল গফুরকে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে সুস্থ ও মাদকমুক্ত করেন। পরে নামাজ কালামের পাশাপাশি তাকে তাবলিগ জামায়াতেও পাঠানো হয়।

সাবিনা দাবি করেন, তার স্বামী গফুর যখন ভালো হওয়ার চেষ্টা করছেন, তখনও এএসআই আলমগীর ও বিপ্লব তার পিছু ছাড়েনি। পরে বাধ্য হয়ে গত ১৬ মার্চ যশোর জিলা স্কুল মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অন্যদের সাথে আব্দুল গফুরও আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় আগের ৫টি মামলায় জামিনে থাকায় পুলিশ গফুরকে আটকে রাখেনি।

কিন্তু এই আত্মসমর্পণে ক্ষুব্ধ এএসআই আলমগীর ও বিপ্লব পুলিশ সুপারের কথা বলে গত ২৪ মার্চ গফুরকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। যা গোটা গ্রামবাসীই জানে। কিন্তু এদিন সন্ধ্যায় পুলিশ সাবিনাকে ফোন করে জানায়, তার স্বামীর কাছ থেকে ৫ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে বাঁচাতে ১০লাখ টাকা লাগবে। এই টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পরদিন (২৫মার্চ) পুলিশ তাকে আটক দেখিয়ে চালান দেয়।

সাবিনা আরো দাবি করেন, স্বামীকে আটকের পরও থেমে থাকেনি পুলিশ। ২৫ মার্চ রাতে দারোগা বিপ্লব তাকে ফোন করে ৯০ হাজার টাকা দাবি করেন। অন্যথায় তার স্বামীর হাত-পা ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে বাড়ির টিভি, ফ্রিজ বিক্রি করে ২৬ মার্চ ২০ হাজার টাকা দেয়া হয় পুলিশকে। সবমিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা পুলিশকে দেয়া হয়েছে বলে জানান সাবিনা।

এই গৃহবধূর অভিযোগ, টাকা দাবির পাশাপাশি এএসআই আলমগীর তাকে বলেন, টাকা পয়সা দিতে না পারলে তুই আমার সাথে রাত কাটালে তোর স্বামীর সব অপরাধ মুছে দেবো।

সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে ২৮ মার্চ পুলিশ সুপার বরারব আবেদন করেন সাবিনা। দুই পুলিশ কর্মকর্তার রোষানল থেকে রক্ষার এই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, এএসআই আলমগীর ও বিপ্লব ফোন করে তাকে হুমকি ধমকিসহ অনৈতিক দাবি করে চলেছেন। তিনি ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই পরিস্থিতিতে এর সুবিচার না পেলে তিনি সন্তানদের নিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবেন।

এরপরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং এসপির কাছে আবেদন করায় রবিবার রাতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা সাবিনার বাড়িতে হানা দিয়ে গালিগালাজসহ হুমকি দিয়ে আসেন। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সোমবার সকালে তিনি সন্তানদের নিয়ে বিষপান করেন। পরে প্রতিবেশিরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে এএসআই আলমগীর অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাবের বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করে বলেন, এটা প্রমাণ করতে পারবেন না।

অন্যদিকে এসআই বিপ্লব হোসেন সাবিনাকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন। দু’জনই অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে যশোর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি ইমাউল হক জানান, সাবিনার স্বামী গফুরকে ডিবি পুলিশ ইয়াবাসহ আটক করেছে। আর সাবিনাও মাদক ব্যবসায়ী। তবে সাবিনার বিষপান বা ওই অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আজমল হুদা জানান, সাবিনা নামে এক নারীর বিষপানের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তার অভিযোগ সম্পর্কেও পুলিশ অবগত। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category