,

“প্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক শিশুর সঙ্গে মিশতে দিন”

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি না করার মন-মানসিকতা ত্যাগ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের স্বাভাবিক ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মিশতে ও একই স্কুলে পড়াশোনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব শিশুদের সহযোগিতায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার পাশাপাশি সবাইকে সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘দশম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০১৭’ উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনো শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রাখা যাবে না। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সব  শিশু সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। ফলে এ ধরনের সব  শিশু নিজ পরিবার থেকে বাড়ির নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে সাধারণ শিশুরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সাথে মিশে মানুষের ভিন্নতা সম্পর্কে জানবে এবং ভিন্নতাকে মেনে নেওয়ার শিক্ষা পাবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১০ সালে একটি বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনো শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা যাবে না’।

শেখ হাসিনা বলেন, এতে করে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা লাভ করবে। এতে গোটা সমাজ ব্যবস্থাই উপকৃত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্য-সম্পন্ন ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার, ইন্টারনেটেও অন্য সবার মতোই সমান পারদর্শিতার সাথে কাজ করতে সক্ষম।

এ সময় প্রতিবন্ধীবান্ধব সফটওয়্যার, অডিও-ভিডিও শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম একটি স্বাভাবিক অবস্থা, এটি শিশুর শৈশব থেকেই দেখা দিতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে তাদের উপযোগী কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ছাড়াও বিসিএসসহ সব শ্রেণির সরকারি চাকরিতে অটিজমসহ সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা সংরক্ষিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আমার কন্যা সায়মা ওয়াজেদের নিরলস প্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অটিজমের গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে এখন বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন। তার উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থ-সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়।

তিনি বলেন, আমরা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর সায়মা ওয়াজেদের পরামর্শে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের কল্যাণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে বাস্তবায়ন শুরু করি।

তার সরকার অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩’ পাস করেছে এবং এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই আইনের আওতায় একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট গঠন করেছি। ট্রাস্টের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে আমরা ৪১ কোটি ৫০ লাখ  টাকা বরাদ্দ দিয়েছি এবং আমি চাই সমাজের বিত্তবানরা এখানে সহায়তা করবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘ডিজ্যাবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেম’ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী ‘প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৮০০ প্রতিবন্ধীর ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালার আওতায় ৬২টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৮ হাজার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।

‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজএ্যাবিলিটিস’ স্থাপনের কাজ চলছে। এখানে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সব শিশুর একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব শিশুর বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের সুবিধার্থে ক্রমান্বয়ে সব বিদ্যালয়ে র‌্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, মূক ও বধির শিশুদের সুষ্ঠুভাবে পাঠদানের লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে’ বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

রধানমন্ত্রী বছরের প্রথম দিনে তার সরকারের উদ্যোগে চালু করা বই উৎসব প্রসঙ্গে বলেন, নতুন বছরের প্রথম দিন আমাদের শিশুরা বই উৎসব পালন করে। একই দিনে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতেও আমরা ব্রেইল বই তুলে দিচ্ছি। নিবিড় শিক্ষা গ্রহণের জন্য দেশের ৭০ হাজার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসসমৃদ্ধ ব্রেইল বই প্রকাশ করছে।

তিনি বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন ও উইথ অটিজম’ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত শিশু শনাক্তকরণসহ বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালু রয়েছে।

তিনি বলেন, বিনামূল্যে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের থেরাপী-সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সব জেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র (ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার) স্থাপন করা হয়েছে। এসব জায়গায় একটি করে অটিজম ও এনডিডি কর্ণার চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো-ডিজঅর্ডার অ্যান্ড  অটিজমের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের অটিজম সমস্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের সকল কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অটিজম প্রকৃতির বিচিত্র খেয়াল হলেও অটিজম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অনেকেই অত্যন্ত মেধাবী হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের রয়েছে অনন্য প্রতিভা। আপনাদের প্রতিভাকে বিকশিত করাই আমাদের লক্ষ্য। বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, ডারউইন, নিউটন জীবনের একটা সময় অটিজমের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছেন। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী উইলিয়াম বাটলার ইয়টস্, ড্যানিস কবি হ্যানস্ এন্ডারসন, বিথোভেন, মোজার্ট প্রতিবন্ধী ছিলেন। বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস  আজীবন প্রতিবন্ধী থেকেও তার আবিস্কার থেমে থাকেনি।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকারের উদ্যোগে জাতীয় প্রতিবন্ধী  ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘আপনারা প্যারা অলিম্পিক ও স্পেশাল অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করেছেন। তাই আমরা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের জন্য ঢাকার অদূরে সাভারে ১২ একর জমিতে ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমরা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াই। তারা আমাদেরই আপনজন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও উপযোগী পরিবেশ পেলে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে উঠে আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. মো. মোজাম্মেল হোসেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমান স্বাগত বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং অটিজম আক্রান্ত শিশু-কিশোর, অভিভাবক ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category