,

জঙ্গিদের টার্গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা!

ষ্টাফ রিপোর্টার: রাজধানী ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানোয় জঙ্গিরা তাদের সাংগঠনিক শক্তি অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে। তাদের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের বেশিরভাগই নিহত হয়েছেন। ফলে তারা প্রায় নেতৃত্ব শূণ্য হয়ে পড়েছে।

নিজেদের এই সংকট মোকাবেলায় জঙ্গিরা দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে হামলা পরিচালনা করছে বলে মনে করছেন অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

গত ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‌্যাবের প্রস্তাবিত সদর দপ্তরের মূল ফটকের কিছু ভেতরে ঢুকে পড়ে অজ্ঞাত এক যুবক। র‌্যাব সদস্যরা তাকে চ্যালেঞ্জ করলে সে নিজের সঙ্গে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এই যুবককে জঙ্গি বলে ধারণা করছে পুলিশ। এর পরদিন ভোররাতে ঢাকার খিলগাঁওয়ে র‌্যাব চেকপোস্টে ঢোকার চেষ্টা করে আরেক অজ্ঞাত যুবক। পরে র‌্যাবের গুলিতে সে নিহত হয়। র‌্যাব ক্যাম্পের ঘটনার এক সপ্তাহ পর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ সড়কের সামনের গোল চত্বরে পুলিশ চেকপোস্টে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এক যুবক। সর্বশেষ শনিবার বিকেলে ও রাতে সিলেটে দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকরে দু দফা বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পুলিশসহ ছয়জন নিহত ও ৪০ জনের মতো আহত হয়। জঙ্গিরা এই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে।   

এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গিরা যে তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে তা সাধারণ মানুষকে বুঝতে দিতে চাইছে না। তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে এগুচ্ছে। 

অন্যদিকে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনটি কারণে এ ধরণের হামলা করতে পারে জঙ্গিরা। প্রথমত, জঙ্গি বিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ডিমটিভেটেড করা। দ্বিতীয়ত, তাদের ভেতরে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের কাভারেজ পাওয়া।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে তা এখনই শনাক্ত করা না গেলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ অনেক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যা পরবর্তী সময়ে মোকাবেলা করা অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টার্গেট করার কারণ হিসেবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ মনে করেন, গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযানে ৪০ জনের বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে। এতে জঙ্গিরা নেতৃত্বশূণ্য হয়ে পড়েছে। তাই তারা এসব বোমা হামলার মাধ্যমে নিজেদের অস্থিত্বের জানান দিচ্ছে। তারা এই বার্তা দিচ্ছে যে, তাদের এখনো যথেষ্ট শক্তি আছে।

জঙ্গিদের যা হচ্ছে তা আত্মহননই বলা যায়। দেখলে মনে হয় তাদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। নেতৃত্ব শূণ্যতায় তারা সুসংগঠিত হতে পারছে না ও অস্তির মনোভাব প্রকাশ করছে।’

আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আশকোনায় ও বিমানবন্দরের সামনে বোমা বিস্ফোরণে নিহত দুজনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা আত্মহনন করেছে। ক্লাসিক্যালি যেসব আত্মঘাতি হামলা আমরা বিদেশে দেখি সেসব হামলার সাথে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এসব হামলার কোন মিল নেই। কারণ আত্মঘাতি হামলা যিনি চালান, তিনি তার সঙ্গে আরো কয়েকজনকে হত্যা করার চেষ্টা করেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্রিমিনোলজী বিভাগের প্রভাষক ও অপরাধ বিশ্লেষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, ‘কাউন্টার টেররিজমে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তারা সবার আগে বেশ সাহসিকতার সাথে জঙ্গি দমনে অংশ নিয়েছে। এ কারণে তারা জঙ্গিদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। আবার জঙ্গিরা ডিমটিভেশন ও মানসিক চাপ তৈরি করার জন্য এসব হামলা করতে পারে।

তাছাড়া জঙ্গিরা গণমাধ্যমের কভারেজ পাওয়ার জন্য এ কাজ করতে পারে। আল কায়দার প্রধান ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. আইমান আল জাওয়াহিরি বলেছিলেন, যুদ্ধের ময়দানে (জঙ্গিদের ভাষায় জিহাদ) সম্মুখ লড়াই হয় মাত্র ৪০ শতাংশ আর ৬০ শতাংশ হয় গণমাধ্যমে। এখন তারা হয়তো সেই সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। সপ্তাহের ভেতরে ঢাকায় দুটি হামলার পর তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ কভারেজ পেয়েছে। সেখানে তারা ফোকাস হচ্ছে, বেশি  প্রচার পাচ্ছে।’

এদিকে এসব ঘটনায় পুলিশের কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন মাহফুজুল হক। তার মতে ‘কোথাও তো একটা ফাঁক আছে।’

মাহফুজুল হক বলেন, ‘ট্রেডিশনাল পুলিশিং, যার মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে সেই ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা উচিত। পুলিশের প্রশিক্ষণের জায়গায় এখনো সেকেলে মনোভাব রয়ে গেছে। আল্টিমেটলি তারা হয়তো অনেক উন্নত সরঞ্জাম পাচ্ছে কিন্তু তারা আত্মরক্ষা এবং সহজে মুভ করার জায়গাটায় অনেকটা পিছিয়ে আছে।’

মাহফুজুল হকের প্রশ্ন, ‘পুলিশ কি আদৌ প্রস্তুত জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে নিজেদের প্রমাণের জন্য?’ 

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ পুলিশ বাহিনী গোয়েন্দা ভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এটি স্বল্প মেয়াদী কিছু সাফল্য পাওয়ার জন্য কার্যকর। আমাদের ভাবতে হবে দীর্ঘমেয়াদী কিছু। জঙ্গি নির্মূলের জন্য সমাজ ও পরিবারের জায়গায় যেতে হবে। জঙ্গিবাদের বিস্তার রোধে সবাইকে সচেতন করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জঙ্গিদের পাল্টা মতাদর্শ দিতে হবে।’

তাছাড়া যে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশনসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ জায়গাকে কী পয়েন্ট ইনস্টলেশনের (কেপিআই) আওতায় আনতে পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে ঢাকায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পর আইএস-এর দায় স্বীকার নিয়ে হতবাক হয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক আব্দুর রশিদ। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, যেসব হামলায় জঙ্গি সংগঠন সার্থক হয় শুধু সে সবেরই দায় স্বীকার করে তারা। আইএস এর ব্যতিক্রম নয়। আইএস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব ছোট খাট হামলা চালিয়েছে সে সবের দায় কখনই স্বীকার করেনি। শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটু ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। এটা তাদের চরিত্রের সঙ্গে মিল খায় না।’

‘বাংলাদেশে কিছু একটা ঘটলেই আইএস ট্যাগ লাগিয়ে কোন একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে এই প্রক্রিয়াটি চালু রেখেছে। যারা আইএসের নাম ব্যবহার করেছ তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে করছে।’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি অনেক কম বলে মনে করেন আব্দুর রশিদ। এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, ‘সারা বিশ্ব জঙ্গি ঝুঁকিতে আছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ অনেক কম ঝুঁকিতে আছে।’

বোমা বিস্ফোরণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়েছে- সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তার (ডিএমপি কমিশনার) মতো একজন যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা; যিনি অনেক দিন ধরে পুলিশি কর্যক্রমের সঙ্গে কাজ করে আসছেন, তিনি যখন এটাকে রাজনৈতিক কারণ করার চেষ্টা করেন তখন কিন্তু এটা দু:খজনক। জঙ্গিবাদের কথা বলতে গিয়ে দায় এড়ানোর মনসিকতা আমরা লক্ষ করছি। পুলিশ কর্মকর্তারা যদি রাজনৈতিক নেতাদের মতো বক্তব্য দেয়া শুরু করেন তাহলে তা দেশের জন্য খারাপ কিছু নিয়ে আসবে, যা দেশবাসীর জন্য একটা অশনি সংকেত।’

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category