,

গৃহকর্মী ফাতেমাকে পুড়িয়ে হত্যা !

খুলনা প্রতিনিধি: গৃহ পরিচারিকা ফাতেমা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে।গৃহকর্তাসহ পরিবারের অমানুষিক নির্যাতন, ফুটন্ত পানি দিয়ে ঝলসে দেয়া এবং সর্বশেষ কেরোসিন ঢেলে পুড়ে দেয়া হয় তার পুরো শরীরটাকে। টানা চারদিন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গতকাল মঙ্গলবার ভোর রাতে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নিহতের পরিবার ও পুলিশ জানায়, বাগেরহাটের মংলার সিগনাল টাওয়ার এলাকার বৃদ্ধ মোজাম সরদারের মেয়ে ফাতেমা বেগম গত নয় মাস আগে রাজধানীর দক্ষিণ কোরানীঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় দোলেয়ারের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেয়।কোনো বেতন ছাড়াই পেটে-ভাতে কাজ করছিল ফাতেমা।গত বৃহস্পতিবার সকালে ফাতেমা বাড়ির লোকজনের কাপড় পরিষ্কার করতে গিয়ে দুটি কাপড়ে রং লেগে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গৃহকর্তা দেলোয়ার ও তার ছেলে আশিক তাকে (ফাতেমা) মারধর করে। পরে গৃহকর্ত্রী সালমা গৃহকর্মীর শরীরে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়। এতে ফাতেমার শরীরের ফোসকা পড়ে এবং অবস্থা বেগতিক দেখে বাথরুমে আটকে রেখে পুরো শরীরে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়।পরে তার পরিবারকে মোবাইল ফোনে জানানো হয় ফাতেমা অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকায় তার কোনো চিকিৎসা না করেই ওইদিন সন্ধ্যায় প্রাইভেটকারযোগে ফাতেমাকে মুমুর্ষ অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে তার পরিবারকে আসতে বলেই পালিয়ে যায় গৃহকর্তা দোলোয়ারের পরিবার। খবর পেয়ে ফাতেমার স্বজনরা খুমেক হাসপাতালে যায়। এখানে চারদিন চিকিৎসাধীন শেষে মঙ্গলবার সে মারা যায়। এরপর ফাতেমার মরদেহ মংলায় আনার পর পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট হাসপাতারের মর্গে পাঠায়।

মৃত্যুর আগে হাসপাতালে স্বজনদের কাছে ফাতেমা বেগম নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। তার এ বর্ণনা ভিডিওসহ মোবাইলে ধারণ করা হয়। এ বর্নণায় কান্না জড়িত কণ্ঠে ফাতেমা নিজেকে বাঁচানোর আকুতি জানায়।আর আগুন আগুন বলেই কাঁদতে দেখা যায়।

ফাতেমা জানায়, প্রথমে বাড়ির গৃহকর্তা দেলোয়ার ও তার ছেলে আশিক তাকে মারধর করে। পরে গৃহকর্ত্রী সালমা তার শরীরে ফুটন্ত পানি ছুড়ে মারে। এ সময় ফাতমা তখন ক্ষত যন্ত্রনায় ছটফট করছিলো। তখন তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তে উদ্ধুদ্ধ করা হয় নিজের শরীরে আগুন দেয়ার জন্য। নানাভাবে চাপও প্রয়োগ করা হয়। প্রতিবেশীরা যাতে না জানতে পারে সে কারণে বাথরুমে আটকে রাখা হয় গরম পানিতে শরীর জ্বলসানো ফাতেমাকে। পরে বাড়ির পাশের একটি মুদি দোকান থেকে কেরোসিন কিনে এনে তার পুরো শরীরে ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মৃত্যুর আগে মোবাইল ফোনে ধারণকৃত এমন বর্ণনা দেখে কাঁদলেন তার বাড়িতে মরদেহ দেখতে আসা প্রতিবেশীরা।

হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নিহত ফাতেমার বড় বোন অরুনা বেগম জানান, যে বাড়িতে কাজ করছিল ফাতেমা সেই বাড়ির গৃহকর্ত্রী তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ভাল কাজ ও বেতনের প্রলোভন দিয়ে তাকে কাজে নেন গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী। তিনি ছোট বোনের উপর চালানো নির্মম এ নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন।

চোখ মুছতে মুছতে ফাতেমার ছোট ভাই ইউনুছ সরদার বলেন, গৃহকর্ত্রী সালমা ফোন করে তাকে বলেন, তোমার বোনের গায়ে আগুন লেগেছে। তুমি তাকে নিতে আসো। পরের দিন জানায়, ফাতেমাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে দগ্ধ বোনকে ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি।

মংলা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. লুৎফুর রহমান জানান, খবর পেয়ে নিহত ফাতেমার বাড়িতে পুলিশ প্রাথমিক ঘটনা অনুসন্ধান করে। পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের বাগেরহাট হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ফাতেমাকে নির্মম নির্যাতনসহ আগুনে পুড়িয়ে দগ্ধ করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ মিলেছে।এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অবহিতকরাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category