,

চায়ের কাপে বিলকিস বেগম

নওঁগা প্রতিনিধি: নারীরা এখন নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। এভারেষ্ট জয় করছেন, পাইলট হয়ে বিমান চালাচ্ছেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে যুদ্ধ করছেন এবং সফলও হয়েছেন। কিন্তু নারী হয়ে জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করে সফল হওয়া সবচেয়ে কঠিন। জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী এক সফল নারী নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বিলকিস বেগম।

শুধু মাত্র দু-বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য সে দশ বছর আগে চায়ের দোকানের মাধ্যমে সংগ্রামী জীবনের যাত্রা শুরু করে শত ভাগ সফল হয়েছেন।

বিলকিস বেগম উপজেলার কাঁদীবাড়ি গ্রামের মানসিক প্রতিবন্ধী ইয়াকুব আলীর স্ত্রী। তিনি এখন বদলগাছী উপজেলা মোড়ের চা দোকানী বিদ্যুতের মা নামে সবারর কাছে পরিচিত। চায়ের দোকান করে ইতিমধ্যে তিনি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে স্বাবলম্বী করে তাকেও বিয়ে দিয়েছেন।

২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ৫ শতক জমি কিনে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে দুই রুম বিশিষ্ট ইটের ঘর তুলেছেন ওই জায়গায়। সংসারে এসেছে স্বচ্ছলতা। কিন্তু তার আজকেই এই পরিচয়ের পিছনে আছে এক লম্বা ঘটনা।

প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে স্বামী ইয়াকুব আলী ব্রেন স্ট্রোক করেন। মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে যায় সে। নিজস্ব জমিজমা না থাকায় দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখতে থাকেন বিলকিছ বেগম। এরই মধ্যে স্বামীর চিকিৎসার খরচ যোগাতে শেষ সম্বল বাড়ির জমিটুকুও বিক্রি করে আশ্রয় নেয় অন্যের জমিতে।

সংসারে পরিশ্রমী কেউ না থাকায় অনাহারে অর্ধাহারে কাটতে থাকে দিন। বাধ্য হয়ে এক সময় দশ বছরের ছেলে বিদ্যুৎকে অন্যের চায়ের দোকানে তিন বেলা খাওয়াসহ সামান্য কিছু বেতনে কাজে দেন। কিন্তু এতে কি সংসার চলে। এক সময় তিনি নিজেই নামেন সংগ্রামের পথে।

হিতাকাঙ্খী দু এক জনের পরামর্শে এনজিও থেকে ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে উপজেলা মোড়ে ফুটপাতের ওপর শুরু করেন চায়ের দোকান। ছেলেকেও সহযোগিতার জন্য কাজ থেকে ছাড়িয়ে নেয়।

দোকানটি উপজেলা মোড়ে হওয়ায় অল্প দিনেই জনপ্রিয়তা পায় সবার কাছে। কোনো মতে তিন বেলা খেয়ে আস্তে আস্তে টাকা জমিয়ে পুঁজি বাড়িয়ে চায়ের সাথে যোগ দেয় বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন হালকা নাস্তার আইটেম। গ্রাহকের চাহিদার কথা বিবেচনা করে যোগ করে বুট মুড়ি মাখা ও সিগারেট বিক্রি। এতে আরও জনপ্রিয়তা বাড়ে বিলকিস বেগমের চায়ের দোকানের।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা হতে সরকারি অফিসগুলোতে কাজের জন্য আসা মানুষগুলোর কাজের ফাঁকে একটু অবসরই যেন বিলকিস বেগমের চায়ের দোকান। সেখানে গেলে এককাপ চাও হয় সাথে স্বল্প মূল্যে ক্ষুধা নিবারনের জন্য আছে মুড়ি মাখা, বিস্কুট ইত্যাদি।

তবে এর মধ্যে বাধাও এসেছে অনেক। ফুটপাত দখলমুক্ত করায় বিপাকে পরেন তিনি। কিন্তু স্থানীয়দের সহযোগিতায় আর তৎকালের চেয়ারম্যাননের সহযোগিতায় ইউপি পরিষদের সামনে একটু জায়গা দেয়া হয় বিলকিস বেগমকে। সেখানে থাকে বেশ কিছু দিন। ইউপি পরিষদের সামনে চায়ের দোকান বিষয়টি খারাপ দেখালে সেখানেও আর থাকা হয় না তার। পরে পরিষদের পিছনে ফাঁকা জায়গায় স্থান দেয়া হয়েছে তাকে। এখন সেখানেই একমাত্র ছেলে বিদ্যুৎকে নিয়ে চলছে তার স্বপ্ন পুরনের লড়াই। তবে দু:খ সরকাররিভাবে কোনো সহযোগিতাই করা হয়নি তাকে।

স্থানীয় আল ফারুক স্টিল এর প্রোপাইটর ফারুক হোসেন জানান, বিলকিস বেগমের স্বামী একজন মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসারে রোজগারের কেউ ছিল না। বাধ্য হয়ে প্রায় বছর দশেক আগে বিলকিস বেগম তার ১২ বছরের ছেলে বিদ্যুৎকে নিয়ে এই চায়ের দোকান শুরু করেন। এই ব্যবসা করে সে ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, জমি কিনে বাড়ি করেছেন। নি:সন্দেহে সে একজন সফল নারী। এ বিষয়ে সরকারি কোনো পুরস্কার থাকলে সেই আগে পাওনাদার।

উপজেলার মথুরাপুর ইউপি মহিলা কাউন্সিলর কারিমা বেগম বলেন, আমি চার বার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছি। সেজন্য আমি দীর্ঘদিন থেকে উপজেলাতে বিভিন্ন কাজে আসি। আমি উপজেলাতে আসলেই এই দোকানে হাল্কা নাস্তা ও চা খেতে আসি। আমি সেই থেকেই দেখছি ছোট্র এই বাচ্চাটিকে নিয়ে সে চা বিক্রি করছেন। তার ব্যবহার ও তার তৈরি চা দুটোই আমার ভাল লাগে। তাই অন্য দোকানে না গিয়ে এখানে আসি। সে একজন পরিশ্রমী মানুষ। নিজের হাতে চা তৈরিসহ সব কাজ করেন।
সংগ্রামী নারী বিলকিস বেগম বলেন, চা বিক্রি করে দিনে ১৫’শ হতে দুই হাজার টাকার মত বিক্রি হয়। এতে লাভ থাকে ২০০ হতে ৩০০ টাকা। আপনাদের দোয়ায় আর আল্লাহর রহমতে ভালই চলছি। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি নাতি-নাতনি হয়েছে এবং ছেলেকেও বিয়ে দিলাম এই ব্যবসা করেই। এই ব্যবসা করে একটু একটু জমিয়ে কেনা জমিতে দুইটা ঘরও করেছি। দোয়া করবেন আগামী দিন যেন এভাবেই কাটাতে পারি। তবে বাপজান আমরা গরিব মানুষ অথচ সরকার হতে কিছুই পাই না।

বদলগাছী সদর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, বিলকিস এক জন পরিশ্রমী নারী। সফল নারীদের যে সরকারিভাবে বিভিন্ন পুরস্কার দেয়া হয় তা আমার জানা ছিল না এবং মহিলা অধিদফতর থেকে আমাকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। আগামীতে আমি অবশ্যই তার নাম প্রস্তাব করব।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category