,

সবার চোখ এরশাদের নতুন জোটের দিকে

ষ্টাফ রিপোর্টার: আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নতুন একটি জোটের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার এই ঘোষণায় রাজনীতির মাঠে ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন প্রধান দুটি দলের শীর্ষ নেতারা।

জোট নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোটসহ প্রায় ১৫টি দলের সাথে ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত কথা হয়েছে বলে জাপা সূত্র নিশ্চিত করেছে। জোটের পরিধি আরো বাড়বে বলেও জানান জাপার শীর্ষ নেতারা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সপ্তাহেই আত্মপ্রকাশ করবে জাতীয় পার্টির নেতৃতে নতুন এ জোট।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এ জোট গঠনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পার্টি চেয়ারম্যানের প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি সুনীল শুভরায়কে প্রধান সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া কয়েকটি দল এবং বিএনপির সঙ্গে থাকা কয়েকটি দলকেও জোটে টানার চেষ্টা করছেন জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

সোমবার ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীসহ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এরশাদ। সাতটি ধর্মভিত্তিক দলের জোট ইসলামী ঐক্যজোট নেতারা আলোচিত সংগঠন হেফাজতেরও নেতা। ‘হেফাজতে ইসলামের’ ঘনিষ্ঠ কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামী দলকে জোটে ভেড়ানোও জাপা নেতাদের লক্ষ্য। ইসলামী ঐক্যজোট নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল দলটি। গত বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ত্যাগ করে ইসলামী ঐক্যজোট।

জাপা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়তে চায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকার আগামী নির্বাচনে বেশি সংখ্যক দলের অংশগ্রহণ চায়। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, সে ক্ষেত্রে জাপার নেতৃত্বাধীন জোট প্রধান বিরোধী জোটের ভূমিকায় থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়াবে।

মঙ্গলবার জাপার বনানী কার্যালয়ে জোটের নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

বৈঠকে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, আমজনতা পার্টি, গণতান্ত্রিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি, ইউনাইটেড মুসলিম লীগ, গণ অধিকার পার্টি, তফসিল ফেডারেশন, জাতীয় হিন্দু লীগ, সচেতন হিন্দু পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস্ ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিপিডিপি) এবং ইসলামী গণ আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া বিএনপির সাবেক শরিক মুসলিম লীগ, এনপিপি, এনডিপিকেও জোটে টানার চেষ্টা করছেন এরশাদ। গত নির্বাচন বর্জনকারী মুসলিম লীগ ও এনপিপির নিবন্ধন আছে। বিএনপির শরিক কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামকেও জোটে আনতে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

এ জোটে চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে দলের অনেক নেতা সম্পৃক্ত করতে চাইলেও অতীতে এ দলের সঙ্গে জোটের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এরশাদ এবার আর ইসলামী আন্দোলনকে ডাকছে না বলে জানা গেছে।

বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ) বা বাংলাদেশ জাতীয় জোট। তবে এই জোটের ৩১ দলের একটিরও নিবন্ধন নেই।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া শওকত হোসেন নিলুর ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামেও একটি জোট রয়েছে। এ জোটের ৯ দলের মধ্যে এনপিপি ছাড়া অন্য কোনো দলের নিবন্ধন নেই। মুসলিম লীগ, তৃণমূল ন্যাপ, ন্যাপ ভাসানী, স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস ও ইসলামিক পার্টি রয়েছে এই জোটে।

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবর বেড়ে ১৮ দলীয় জোট হয়।

বিএনপি জোটের বর্তমান শরিকরা হলো-জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, ন্যাপ ভাসানী, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস লীগ ও ডেমোক্রেটিক লীগ। পরে পর্যায়ক্রমে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও সাম্যবাদী দলের একাংশ এই জোটে যোগ দিলে তা ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। এই জোটেরও বেশির ভাগ দলেরই নিবন্ধন নেই।

এরশাদের এ জোট গঠন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, উনি তো একটি জোটে আছেনই। সেই জোটের সাথে নির্বাচন করে তারা আজ বিরোধী দল। তারা সরকারে আছে, তাদের মন্ত্রী আছে। তাছাড়া এরশাদ নিজেই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি যদি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে, এরশাদ যদি দূতের পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলেই তার জোট সম্পর্কে মূল্যায়নের প্রশ্ন আসবে। নতুবা এই জোট গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কারণ, অনেকে মনে করে সরকারের ইন্ধনেই এ জোট হচ্ছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট হতেই পারে। এরশাদ সাহেব বেশ কিছুদিন ধরেই নতুন জোটের কথা বলে আসছিলেন। আমরা জাতীয় পার্টির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমরা চাই আগামী নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, সামনের নির্বাচনে বিএনপিকে অবশ্যই আসতে হবে। এরশাদের নেতৃত্বে এ জোট নির্বাচনে এলে আমার মনে হয় বিএনপির চেয়ে ভালো ফলাফল করবে।

জাতীয় পার্টির জোট সম্পর্কে দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি বলেন, দেশে বড় যে দুটি জোট আছে, তারা জাতিকে কিছুই দিতে পারেনি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দলগুলো নিয়ে নতুন এ জোট করতে যাচ্ছি। এরশাদ যে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তা নব্বইয়ের পর কোনো সরকারই করতে পারেনি। এটি উপলব্ধি করেই অনেক রাজনৈতিক দল আমাদের সাথে জোটবদ্ধ হবার আগ্রহ প্রকাশ করছে। আমরা আশা করি এই জোটই আগামীতে জনগণকে আলোর দিশা দেখাতে পারবে।

সম্ভাব্য নতুন জোটের প্রধান সমন্বয়ক, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক সচিব সুনীল শুভরায় বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা প্রথমে ৭টি দল নিয়ে জোট করার কথা ভাবছিলাম। আমাদের চেয়ারম্যান যখন এ জোট গঠন নিয়ে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য রেখেছেন, তারপর থেকে অনেক রাজনৈতিক দল আমাদের সাথে জোট করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের জোটে যেসব দলের কথা শুনছেন, তার বাইরেও আরো দল আমাদের সাথে জোটে থাকবে।

আর কারা থাকবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন বলবো না। তবে এই জোট নিয়ে আরো চমক আছে। অপেক্ষা করুন।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category