,

মরছে নদী, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

সিলেট প্রতিনিধি: ভাটি বাংলা হিসেবে খ্যাত সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা উপজেলার এক সময়ের খরস্রোতা এবং মাছে ভরপুর নদী-নালা-খাল-বিল পলি ভরাট এবং দখলের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে। হুমকির মুখে পড়ছে মাছসহ হাওরের জীববৈচিত্র্য। দিরাই-শাল্লায় প্রবহমান নদী কালনী, সুরমা, দাড়াইন, চামটি, হেরা চাপটি, পিয়ান নদী এবং হাওরের খাল-বিলগুলো আর আগের রূপে নেই। ফাল্গুন-চৈত্রমাস এলেই এসব নদীতে জেগে উঠছে চর, খাল-বিলগুলো শুকিয়ে হয়ে যায় একাকার।

ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। হাওরের গভীরে থাকা অনেক ছোট ছোট বিলের কোনো অস্তিত্বই নেই। এসব বিলের মানচিত্রটুকুও গিলে ফেলা হয়েছে। বছরের পর বছর হাওরের তলদেশে থাকা ছোট-বড় শত শত বিল বা জলমহালের বিরাট একটি অংশ ভরাট করে ধানীজমি হিসেবে ক্ষমতাসীনরা নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করছে।

দিরাই উপজেলা মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, কাগজে-কলমে প্রবহমান নদীসহ ২১টি নদী, ২০ একরের ঊর্ধ্বে ৭১টি বিল এবং ২০ একরের নিচে ১১৭টি বিল থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ নদী ও বিলের কোনো অস্তিত্ব নেই। দখল আর পলি মাটির চাপায় হারিয়ে গেছে। প্রবহমান কালনী নদীকে বদ্ধ নদী দেখিয়ে প্রসাশনের যোগসাজশে একটি প্রভাবশালী মহল তার নাম পরিবর্তন করে ৬টি ভাগে ভাগ করে ২০০৯ সালের নীতিমালার আলোকে মৎস্যজীবীদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিক হীন স্বার্থে লিজ দেয়া হয়।

আজ কালনী নদী মরতে বসেছে। চামটি নদীটি ভরাট আর দখলের কবলে পড়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। ভরাটকৃত নদী ও বিল খাস জমির ওপর নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড দফতর থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাবশালীরা নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নিচ্ছে। ভূমিহীনদের অধিকার খর্ব করে খাসজমিতে পুকুর খনন ও ধানক্ষেত করে ক্ষমতাসীনরা সরকারের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয়ের ক্ষতি করছে। স্থানীয় অধিবাসী ও মৎস্যজীবীরা কালনী নদীর লিজ বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, নদী ও হাওরের গভীরে থাকা ডোবা, বিল বা জলমহালগুলোতে এক সময় মাছে ভরপুর ছিল। হাওরের তলদেশ শুকিয়ে গেলে এসব ডোবা, বিল থেকে কৃষকরা জমিতে সেচের চাহিদা মেটাত এবং বিলপাড়ের মানুষ এখান থেকে মাছের চাহিদা মেটাত। এসব বিল বা জলমহালের ওপর নির্ভর করতো এ অঞ্চলের মৎস্যজীবী জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা। লিজের নামে প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় একদিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে সেচ সংকট অপর দিকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাছের আবাস স্থল এবং জীববৈচিত্র্য। ভাঙ্গাডহর মৌজায় শিন ডোবা নামের বিলটির বর্তমানে কোনো চিহ্নই নেই। একই মৌজায় ৪৮ একর নিয়ে বিস্তৃত দিরাই চাতল বিলটির আয়তন কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

তাড়ল ইউনিয়নের সড়ালিতোপা গ্রামের পার্শ্বে অবস্থিত ভুরঙ্গী বিল ৬২ একর সীমানা নিয়ে বিস্তৃত থাকলেও বর্তমানে এর চিহ্নটুকুও নেই। সবটুকুই এখন ধানক্ষেত। এমনিভাবে দিরাই-শাল্লার ছোট-বড় অর্ধশত বিল দখলের কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, নদী ভরাট, হাওরের জলাশয় ও খালগুলোতে শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় সেচ সংকটের কারণে কৃষি বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। নদী খনন এবং দখলের কবল থেকে জলাশয়গুলো উদ্ধার করা না হলে অচিরেই এ অঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।

দিরাইয়ের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক জানান, মাছের বংশ বৃদ্ধির জন্য উপযোগী জলজউদ্ভিদ কমে যাওয়া মাছের বৃদ্ধি দিন দিন কমছে।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category