,

সাগরে পাইপলাইন বসাবে বিপিসি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে একটি পাইপলাইন বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল খালাসে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। জ্বালানি তেল খালাসে লাইটার জাহাজের উপর নির্ভরশীলতা কমানোসহ কোটি কোটি টাকা খরচ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় মহেশখালীতে একটি প্লাটফরম তৈরি করা হবে। ওখান থেকে একটি ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ জাহাজে লাগানোর ব্যবস্থা থাকবে। অপর একটি ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ মহেশখালী থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত নিয়ে আসা হবে। জাহাজ থেকে পাম্পের সাহায্যে তেল পাইপলাইনে দেয়া হবে। যা কিছু প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসা হবে। এখানে পরিশোধনের পর পাইপ লাইনে তেল বিপিসির তিনটি তেল বিপনন কোম্পানির ট্যাংকে চলে যাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত আধুনিক এবং গতিশীল হবে। এরফলে বছরে ৪৫ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে কোন ধরনের বেগ পেতে হবে না বলেও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, সাগরের তলদেশে ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে সরাসরি তেল খালাস করা হবে। বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল খালাসের ক্ষমতাসম্পন্ন এই পাইপলাইনটি বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত স্থাপনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চায়না এক্সিম ব্যাংক পুরো প্রকল্পের অর্থায়ন করছে।

সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সেক্টরের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর তলানি থেকে উৎপাদিত কিছু জ্বালানি তেল ছাড়া বর্তমানে দেশের চাহিদার প্রায় ৫০ লাখ টন তেল পুরোপুরিভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এরমধ্যে ১২/১৩ লাখ টন ক্রুড অয়েল এনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। বাকি জ্বালানি তেল পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়।

ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে পারে। অপরদিকে প্রস্তাবিত ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বছরে পরিশোধন করতে পারবে ৩০ লাখ টন ক্রুড অয়েল। বছরে এই ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে পরিশোধন করা গেলে জ্বালানি তেল আমদানি খরচ বহুলাংশে কমে যাবে। প্রাথমিকভাবে প্রতি লিটার তেলে ছয় টাকার মতো সাশ্রয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এনে পরিশোধন করে বাজারজাত করা গেলে পরিশোধিত হিসেবে আমদানি করতে যে টাকা খরচ হবে তার থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বিপিসি বিদ্যমান ইস্টার্ন রিফাইনারিকে পুরো সক্ষমতায় পরিচালন এবং দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল নিয়ে আসা জাহাজগুলো অত্যন্ত বড় হয়। আবার যত বড় জাহাজে তেল পরিবহন করা যায় খরচ ততই সাশ্রয় হয়। এই অবস্থায় এক লাখ টন ধারণ ক্ষমতার একটি মাদার ভ্যাসেল কুতুবদিয়া বা মহেশখালীতে আসলেও তা চট্টগ্রাম বন্দরে আনা সম্ভব নয়। পুরো তেলই লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করতে হবে। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এক একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে তেল লাইটারিং করতে ১০/১২ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। জাহাজের অবস্থানকাল এবং প্রতিদিনের ভাড়া মিলে তা বেশ বড় একটি অংকে গিয়ে ঠেকে। এছাড়া সিস্টেম লসের নামে কোটি কোটি টাকার তেল লোপাট করে দেয়ারও একটি ব্যাপার স্যাপার থেকে যায়।

পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চিন্তাভাবনা এবং আলাপ আলোচনার পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ক্রুড অয়েল লাইটারিং না করে মহেশখালী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থা করতে একটি প্রকল্প নেয়। বেশ আগে নেয়া প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য বিশ্বের নানা দেশের সাথে আলোচনাও করা হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির ব্যাপারে ইতিমধ্যে এই ব্যাপারে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটির কাজ পেয়েছে চীনা কোম্পানি চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো বা (সিপিপিবি)। একই সাথে চীনের এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম ব্যাংক) প্রকল্পটির সমুদয় অর্থ সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য রাজি হয়েছে। এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে এসে সাইট পরিদর্শন করে গেছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির পারফরমেন্স, আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছু দেখে এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদলটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আকতারুল হক বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে আমরা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছি। ইতিমধ্যে সিপিপিবির সাথে চুক্তি সম্পাদন হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি তেল পরিবহন খাতে বিরাজিত সব সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category