,

আইনের ধারায় তিন ভাই বোন আলাদা


ষ্টাফ রিপোর্টার:


মায়ের হেফাজতে দিলে আমরা আত্মহত্যা করবো। মা খারাপ, সে কোন দিনই আমাদেরকে সন্তানের পরিচয়ে মানুষ করতে পারবে না। আমাদের তিন ভাই-বোনকে কোন দিনই সে আপন করে নিতে পারবে না।   গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কুষ্টিয়ার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসের সামনে দাঁড়িয়ে এ ভাবেই বার বছরের শিশু সোহা আদালতের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আকুতি জানান। শিশু সোহা বলেন- আমাদের মায়ের হেফাজতে দিলে আমরা আত্মহত্যা করবো। আইনের কাছে যেন মানবিক বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সন্তানদের এমন আহাজারিতে বিকেলে পুনরায় আদালত বসানো হয়। আদালত দীর্ঘ সময় মা-বাবা আর সন্তানদের উপস্থিতিতে আরেক দফা রায় ঘোষণা করেন। বাদী বিবাদীর সম্মতিতে রায়ে দুই বছর ৭ মাসের সন্তান ফারাবীকে তার মায়ের হেফাজতে দিয়ে বাকী দুই সন্তান ১২ বছরের সোহা আর ৭ বছরের তাহশীদকে বাবার হেফাজতে থাকার আদেশ দেন। তবে এই আদেশেও খুশি হতে পারেননি তিন সন্তান বরং রায় শোনার পর তিন শিশু আদালত কক্ষেই পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এসময় সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা ঘটে। আদালতের বিচারক এবং অন্যান্য কর্মচারীরাও আবেগ আপ¬ুত হয়ে অশ্রসিক্ত হয়ে পড়েন। পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে মা ছোট সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরেন আর অন্য দুই সন্তান তাদের বাপের সাথে বাড়িতে ফিরে যায়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই হৃদয় বিদারক ঘটনাটি ঘটে কুষ্টিয়া কাক্টেরেট কার্যালয়ের  নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে।

[metaslider id=289]

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের  ৪ মে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ভাদালিয়া গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম তারিকের সাথে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার থানাপাড়া এলাকার সানজিদার বিয়ে হয়। সানজিদার অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই  স্বামী তারিকের পরিবারের লোকজনের অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। পারিবারিক নানা অশান্তির কারনে দীর্ঘ ১৩ বছরের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটে ২০১৬ সালের ২১ আগষ্ট। এর আগে স্ত্রী সানজিদা ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর শ্বশুর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে সন্তানদের রেখেইে বাবার বাড়ি চলে যায়। তাদের ঘরের তিন সন্তান নিয়ে তারিক নিজ বাড়িতে বসবাস করে আসছিল। আর স্ত্রী সানজিদা বাবার বাড়িতে বসবাস শুরু করে। সামাজিকভাবে তাদের দাম্পত্যের কলহ মিটানোর বহু চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

এদিকে স্ত্রী সানজিদা গত বছরের ১৬ মার্চ নারী নির্যাতন আইনে কুষ্টিয়ার নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এরই মাঝে সানজিদা নাবালক সন্তানদের নিজ হেফাজতে ফিরে পেতে আদালতে আরো একটি আবেদন জানায়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শুনানী শেষে কুষ্টিয়ার নির্বাহী ম্যজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক সীমা শারমিন তিন সন্তানকে বাবার হেফাজত থেকে মায়ের হেফাজতে দিতে নির্দেশ দেন। বিচারকের এমন আদেশের পর তিন শিশুর কান্নায় আদালতের পরিবেশ মুহুর্তের মধ্যে পাল্টে যায়। তাদের কান্না আর আহাজারিতে পুরো আদালত এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। শিশুদের আর্তনাদ আর কান্নায় আদালতে উপস্থিত সকলের চোখে পানি চলে আসে। আদেশের পর পুলিশ শিশুদের মায়ের হেফাজতে দিতে গেলে তারা তিন ভাই বোনসহ পিতাকে জড়িয়ে আদালতের চেয়ার আকড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। এসময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও যেন নির্বাক হয়ে পড়েন। বড় সন্তান আদিবা আনজুম সোহা চিৎকার দিয়ে তাদের পিতার নিকট ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আদালতের নিকট আবেদন জানান। এ সময় সোহা এবং অন্য ভাই আবুজর গীফারী তাওশী বলেন, আমরা শিশু, আমাদের পিতা আমাদের লালন পালন করেছেন। মাকে আমরা চিনি না। আমাদের জোর করে মায়ের কাছে দিতে গেলে আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় থাকবে না। এই বলে তারা আদালতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সন্তানদের পিতা তারিকুলও বেঞ্চে বসে সন্তানদের জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।

এই পরিবেশে বিকেলে দু’পক্ষের উপস্থিতিতে পুনরায় আদালত বসানো হয়। আদালতের বিচারক পৃথক পৃথকভাবে সন্তান এবং পিতা ও মাতার বক্তব্য শোনেন।  দীর্ঘসময় উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে  এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে ছোট ছেলে ওয়াসি হাসান ফারাবীকে মায়ের নিকট এবং অন্য দুই সন্তানকে পিতার হেফাজতে দেয়ার নির্দেশ দেন আদালতের বিচারক নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সীমা শারমীন। আদালতের এ রায়েও সন্তোষ হতে পারেননি সন্তানেরা। রায় শুনে সন্তানেরা আবারো হাউমাউ করে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। তখন পুলিশ বিশেষ ব্যবস্থায় উভয় পক্ষকে আদালত চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে কাঁদতে কাঁদতেই সকলেই আদালত ত্যাগ করে। এসময় আদালতের বাইরে উভয় পক্ষের মহিলাদের হাতাহাতি করতে দেখা গেছে।

জানা যায়, ছোট ছেলে ফারাবী জম্মের পর থেকেই ফুফুর লালন পালনে বড় হয়ে উঠে। ফারাবী জম্মের পর থেকে গর্ভধারীনি মাকে চেনে না। ফুফুকেই মা বলে ডাকে। গতকাল ফারাবীর মা (ফুফু) জানান- আমার কোন সন্তান না থাকায় জম্মের পর থেকেই আমি ফারাবীকে দত্তক নিয়ে নিজের সন্তান হিসেবে লালন পালন করি। ফারাবী আমাকে মা এবং আমার স্বামীকে বাবা বলেই ডাকে। আমরা স্বামী-স্ত্রী পিতা-মাতার স্নেহ দিয়েই তাকে এই আড়াই বছর পালন করেছি। সরেজিমেন দেখা গেছে শিশু ফারাবী তার গর্ভধারিনি মাকে চেনেই না। রায় ঘোষণার পর ফারাবী গর্ভধারিনি মায়ের কোলে এসে চিৎকার দিয়ে বাবা-মা বলে কাঁদছিল। ফারাবীর কান্নায় কালেক্টরেট চত্বর এলাকায় অন্য রকমের এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুই ভাইবোন থেকে পৃথক হওয়ার পর থেকেই ফারাবীকে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। লালন পালন করা মায়ের (ফুফু) কোলে যাওয়ার জন্য আকুতি করছিল কিন্তু আইনের কাছে ফারাবীর এই আকুতি কাজে আসেনি। তবে আদালতের মাধ্যমে সন্তানকে প্রকৃত মায়ের কোলে তুলে দিতে পারায় উপস্থিত সকলেই আদালতের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আর মা সানজিদা অন্তত তিনটির পরিবর্তে একটি সন্তান ফিরে পাওয়ায় খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েন। জম্মের পর থেকেই গর্ভধারিনি মায়ের কোল ফাঁকা করেছিল স্বামীর বাড়ির লোকজনেরা। সেই শোক আর দুঃখে কাতর সানজিদার আকুতি আদালত সুবিচারের আরো একটি জলন্ত নিদর্শন যেন সবাইকে আবেগ তাড়িত করেছে।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category