,

সোনালী আঁশের সুদিনের প্রত্যয়ে পাটবন্ধুদের আড্ডা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কেউ এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে, কেউ এসেছেন রংপুর কিংবা চট্টগ্রাম থেকে; বাদ যায়নি জামালপুর, কুড়িগ্রাম থেকেও। ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘পাটের লড়াই’ নামক সংগঠনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁরা এসেছিলেন সবাই। পাটপণ্য উদ্যোক্তারা যেমন এসেছিলেন, তেমনি এসেছিলেন সরকারি-বেসরকারি পাট কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী,শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক সহ আরো অনেকেই। সবাই এসেছিলেন পাটবন্ধু হয়ে, আড্ডা আড্ডায় নিজেদের মতামত বিনিময় করতে, হারানো ঐতিহ্য সোনালী আঁশ খ্যাত পাটকে ‘হীরক আঁশ’ এর মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যাক্ত করতে।

২০ জানুয়ারি, শুক্রবার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্যে কেন্দ্রে ‘পাটবন্ধু আড্ডা’ শীর্ষক আড্ডা এবং মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ‘পাটের লড়াই’ নামক একটি সংগঠন। বিকাল ৪টায় আড্ডা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়েরঅনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাটবন্ধু আড্ডায় রেজিস্টার্ড সদস্যদের আগমনে।

পাটবন্ধুর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেয়ার মাধ্যমে শুরু হয় আড্ডার মূল পর্ব। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশের পাটশিল্প ও পাটপণ্য উদ্যোক্তাদের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন আগত পাটবন্ধুরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের মহাপরচিালক ওয়াসিম জব্বার, কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া জুট ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের টিম লিডার শেখর ভট্টাচার্য, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মাদ মইনুল ইসলামসহ পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সাথে জড়িত ৩০ প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যাক্তিসহ বিভিন্ন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ জন পাটবন্ধু।

পাটবন্ধু আড্ডার শুভেচ্ছা বক্তব্যে ‘পাটের লড়াই’র প্রতিষ্ঠাতা নাসিমূল আহসান বলেন, পাটের লড়াই কৃষক, পাটপণ্য উদ্যোক্তা ও পাটের সাথে সংশ্লিষ্ঠ সবার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে চায়। সবাইকে নিয়ে সবার জন্য কাজ করতে চায়। কৃষকদের কাছে পাটচাষ সংক্রান্ত দরকারি তথ্য পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি কৃষকদেরকে পাট চাষ ও পাটবীজ উৎপাদনে উৎসাহী করতে চায়। পাটপণ্য উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পণ্য ডিজাইন ও আইসিটি সেল করতে চায়, যেখানে পাটপণ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের লোগো থেকে শুরু করে প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি, ব্রান্ডিং ও মার্কেটিংসহ সব ধরনের কাজ করা হবে।

তিনি জানান, পাটপণ্যকে জনপ্রিয় করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে। ইতিমধ্যে পাটের লড়াই সেই কাজটি শুরু করেছে। আমরা শুধুমাত্র পাটপণ্য নিয়ে দেশের প্রথম অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘ইউজুট’ তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। ইউজুট পাটপণ্য ক্রেতা ও বিক্রেতার মাধ্যমে এটি একটি চমৎকার সেতু হয়ে উঠবে, যা দেশীয় বাজারে পাটপণ্যের ক্রয়চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।

শিশুদের ও কিশোরদের মাঝে পাটপণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলার গুরুত্ব সর্ম্পকে বলতে গিয়ে তিনি বলেন,আজকের শিশু কিশোররাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। ওদেরকে পরিবেশবান্ধব চেতনায় বড় করা গেলে, পাটপণ্য সম্পর্কে সচেতন করা গেলে সেটা দারুণ কাজ হবে বাংলাদেশের পাটশিল্পের জন্য। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা যাতে পাটপণ্য চিনতে পারে, জানতে পারে এবং সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে সেজন্য ‘জুট ফর কিডস’ নামের একটি উদ্যোগ আমরা হাতে নিয়েছি।

অনুষ্ঠানে আগত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের মহাপরচিালক ওয়াসিম জব্বার বলেন, পাটশিল্পকে এগিয়ে নিতে এর সাথে সংশ্লিষ্ঠ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। সোনালী আঁশকে যে আমরা হীরক আঁশের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন আমরা দেখছি, সেই স্বপ্নকে সবাই মিলে একসাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, পলিসি সাপোর্ট না থাকলে কোন শিল্পই দাড়াতে পারেনা। পাটকে গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিতে হলে আমাদের সঠিক পলিসির দরকার। পাটনীতির দ্রুত বাস্তবায়ন খুব জরুরি। পাটনীতিতে যে বিষয়গুলোর উল্লেখ আছে, সেগুলো গুরুত্বের বিবেচনায় আমাদের একটা একটা করে কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

কেয়ার বাংলাদেশের সুইচ এশিয়া জুট ভ্যালু চেইন ডেভলপমেন্ট প্রকল্পের টিম লিডার শেখর ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের মাটি, আমাদের জমি পৃথিবীর মধ্যে পাট উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে অনুকুল জমি। কিন্তু পাটবীজ উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে আছি। প্রতিবছর আমাদের সাড়ে চারহাজার মেট্রিকটন বীজ আমাদের প্রয়োজন হয়, অথচ আমরা উৎপাদন করতে পারি মাত্র ১২০০ মেট্রিকটন। সরকারকে এই জায়গায় কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আগত কারুকাজ প্রোডাক্টস -এর সিইও এবং ডিজাইনার আবদুল খালেদ বলেন, বিশ্ববাজারে পাটের ব্যাপক সম্ভাবনা ও চাহিদা সত্ত্বেও আমরা সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছিনা। পাট নিয়ে চিন্তাভাবনাটা এখনো আমাদের ক্ষুদ্র পরিসরেই আটকে আছে। বেশি মুনাফার আশা না করে, পাটপণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে নিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও কারিগরি দিক দিয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এ সময় তিনি ‘পাটবন্ধু ডিজাইন হাউস’ নামে একটি আলাদা শাখা তৈরির প্রস্তাব করেন।

আড্ডায় কুড়িগ্রাম থেকে আগত চারকোল মিল অ্যান্ড স্টোর -এর স্বত্ত্বাধিকারি মাসুদুল ইসলাম বলেন, পাট গাছের মধ্যে পাটখড়ি ছিল সবচেয়ে অবহেলিত। সাধারণ রান্নাবান্না এবং বেড়ার কাজ ছাড়া এটির ব্যবহার আমাদের দেশে ছিল না। কিন্তু আমরা সেই পাটখড়িকে কাজে লাগিয়ে এখন সম্পদে পরিনত করতে পেরেছি। চারকোল ব্যবসায় অনেকেই না বুঝে এবং সঠিক ধারণা না নিয়ে আসছেন, আসার আগে অবশ্যই এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে আসবেন।

ক্রাফটভিশন -এর স্বত্ত্বাধিকারি ইব্রাহিম খলিল বলেন, পাটশিল্প অগ্রগতির ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা আমাদের প্রধান অন্তরায়, এটিকে আগে দূর করতে হবে। পাশের দেশ কলকাতায় পাটপণ্য কেনাবেচার জন্য ‘জুট পল্লী’ আছে কিন্তু আমাদের দেশের পাটপণ্য উদ্যোক্তা এবং ক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই। আমি বিশ্বাস করি, বিজেএমসি, জেডিপিসি আমাদের জন্য কাজ করবে যদি আমরা তাদের সঠিকভাবে বুঝাতে পারি।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category