,

তেত্রিশেই আমি এক অশীতিপর বৃদ্ধা

হোসনে আরাঃ হাঁটছিলাম রাজধানীর ব্যস্ত পথে; জানুয়ারি মাসের কিছুটা তীব্র শীতের বিকেলে।

হাঁটার দু’টো উদ্দেশ্য ছিল। এক. রাস্তার অস্বাভাবিক ট্রাফিক জ্যামকে উপেক্ষা করে বন্ধুর সাথে সময়মতো দেখা করা, দুই. এই ব্যস্ত শহরটাকে এবং এর ব্যস্ততম মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা। বলা বাহুল্য, এই সুযোগে টাকাও বাঁচানো। এককথায় বলা যেতে পারে, রথ দেখা ও কলা বেচা।

বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। চারিদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আমি তখন খামারবাড়ির পরের রাস্তা দিয়ে ফার্মগেটের পথে হাঁটছি।

পথে কতকিছুর দেখা মিলল! এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সিটি কর্পোরেশন ও সম্ভবত ওয়াটারএইডের উদ্যোগে তৈরি করা অত্যাধুনিক ও পরিচ্ছন্ন টয়লেটের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রতি ৮/১০ হাতের ব্যবধানে প্রাকৃতিক টয়লেট, যা প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে অথবা তার আশপাশেই অবস্থিত। এর প্রতিটিই মূত্ররসে টইটম্বুর, যার ‘সুগন্ধ’ একদমই ফ্রি। দুর্ভাগা পথচারীরা নাক চেপে কোনো রকমে পেরিয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে যে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলো, তা হলো এই প্রাকৃতিক টয়লেটগুলোর ওপরই পলিথিন ও অন্যান্য বস্তু বিছিয়ে নিজ নিজ বিছানা করতে ব্যস্ত কিছু অশীতিপর নারী। বিষয়টি যদিও আমাদের দেশে নতুন নয়, বিশেষত ঢাকা শহরে; কিন্ত তথাপিও মনটা যেন কেমন করে উঠল। তাঁদের মধ্যে ক’জন একটু তর্কেও জড়িয়ে গেলেন জায়গা নির্দিষ্ট করার বিষয় নিয়ে।

কয়েক মিনিট দাঁড়ালাম এবং উপলব্ধি করলাম, এই অসহনীয় দুর্গন্ধ ও কনকনে শীতে এই বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য কি আমাদের কিছুই করার নেই? আমরা কি চোখ থাকতেও দেখতে পাচ্ছি না?

অন্যান্য সময়ের মতো ভাবনাটা কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল। ভাবলাম, আর মাত্র ক’টা বছর। এরপর আমিও বৃদ্ধ। তাহলে আমারও কি এমন হবে অথবা আমার পাশের যে বন্ধু বা প্রতিবেশী, যারা আজ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, কাল তো তারাই বয়োজ্যেষ্ঠ, তাহলে তাদের কী হবে!

গত কয়েকদিনের শীতে আমরা যখন ইট-পাথরের দেয়ালে ঘেরা কংক্রিটের ছাউনির নিচে থেকেও লেপ-কম্বল, সামর্থ্য অনুযায়ী রুমহিটার কিংবা এয়ারকন্ডিশন্ড রুমে থাকছি, তখন কি আমরা একবারও ভাবতে পারছি এই অশীতিপর বৃদ্ধারা কীভাবে খোলা আকাশের নিচে, প্রস্রাবের কারখানার ওপর বিছানা পেতে এত বড় রাতটা কাটাবেন!

আজকের শক্ত-সমর্থ্ আমিই কিন্তু কাল বৃদ্ধা বা বৃদ্ধ। বিশ্বাস করি, প্রকৃতি প্রত্যেকের কর্মের ফল কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দেয়, সে আমরা বুঝতে পারি কিংবা না-ই পারি। যদি ধরে নিই ওই সকল বৃদ্ধা তাদের পূর্ববর্তী জীবনের কর্মের ফল ভোগ করছেন, তাহলে আমাদের আজ এখনিই ভাবতে হবে, আমি আজ যা করছি, নৈতিক বিচারে তা ঠিক আছে তো? তা না হলে, আমিও তো এ ধরনের কষ্ট ভোগ করবো, আজ নয়, কালই, নয়তো পরশু।

দেশের বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা আছে। আমি সম্পূর্ণ একমত পোষণ করি এর সাথে। জলজ্ব্যান্ত সন্তান বা একাধিক সন্তান থাকতে বাবা-মা কেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকবেন?

কিন্তু আমাদের এও ভুললে চলবে না, সকল দম্পতির সন্তান থাকে না, বা থাকলেও এতোটা কর্মক্ষম নয় যে, একটি বড় পরিবার সামলাতে পারবেন। কিন্তু আমিও বিশ্বাস করতে চাই যে, আমরা যদি সদিচ্ছা পোষণ করি তবে পিতামাতার ভরণপোষণ কোনো ব্যাপার না, তারা জগৎ-সংসারে আল্লাহর নিয়ামত। তাঁরাই পারেন পারিবারিক বন্ধনটাকে সূদৃঢ় করতে এবং সুশৃঙ্খল ও স্বাভাবিক সমাজ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে।

এতো কিছুর পরেও ‘যদি’বলে একটা কথা থাকে, যার জন্য আসলে সময়ের চাহিদা বৃদ্ধাশ্রম বলি আর ওল্ড হোমই বলি, এর প্রয়োজন দিনের পর দিন বাড়বেই। বিশেষত, বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ যখন বর্ডারহীন ভাবছে নিজেদের, কাজের গণ্ডি ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে নগরে, দেশ থেকে অন্য দেশে, তখন একে আর অস্বীকার করার কোনো উপায় হয়তো থাকবে না অদূর ভবিষ্যতে। তবে কথা থাকে এর রূপ কেমন হবে, কিভাবে এর তদারকি হবে এসব নিয়ে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কতগুলো উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। যেমন- বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, বৃদ্ধাশ্রম, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে কিছু অস্থায়ী শেলটারের ব্যবস্থা এবং কিছু ছোটখাটো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যদিও জনমনে প্রশ্ন থাকে এ সমস্ত উদ্যোগের যথার্থ প্রয়োগ ও স্বচ্ছতা নিয়ে।

তবে এতো কিছুর মাঝেও সবচেয়ে বড় যে জিনিসটির অভাব আছে বলে আমার মনে হয়, তা হলো সন্তানদের মূল্যবোধ শিক্ষা, যা সবক্ষেত্রেই, যেমন পরিবার থেকে রাষ্ট্র ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে, ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রসঙ্গক্রমে আমাদের দেশের কোনো একটা চ্যানেলে প্রচারিত ইসলাম বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে একজন প্রবাসী সন্তান প্রশ্ন করছিলেন যে, তার অনেক টাকা যাকাত বাবদ দিতে হয়; কিন্তু তার বাবা-মা অনেক দরিদ্র। এমতাবস্থায় সে ও তার স্বামী কি ওই যাকাতের টাকা তার পিতা-মাতাকে দিতে পারবে? এর উত্তরটা আমার ভালো লেগেছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ কেমন ধনী সন্তান, যার যাকাতের টাকা পিতা-মাতাকে দিতে হয়। সে কি তার উপার্জিত অর্থ থেকে পিতা-মাতার সেবা করতে পারে না?

বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে হয়, ‘বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ভাবতে ভালোই লাগে।’ আমাদের মানসিকতা এমন হলে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা তো বাড়বেই।

আর আজকাল তো পরিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় – সবক্ষেত্রেই যে শিক্ষা প্রচলিত আছে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নতুন প্রজন্মকে দক্ষ ও কর্মক্ষম করে তোলা। যে শিক্ষা তাকে জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ের কর্মোপযোগী জনশক্তিতে রূপান্তর করবে। আমরা কিন্তু ভাবছি না, এর পরিণতি কী হতে পারে।

তবে এর মধ্যেও কিছু আশাজাগানিয়া তথ্য আমাদের আলো দেখায়। যেমন, বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তি শতকরা হারে মোট জনসংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বলা হয়ে থাকে, এটি একটি দেশের স্বর্ণযুগ যখন দেশটি সর্বোচ্চ পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিগণিত হওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি আশীর্বাদ। কিন্তু এই যদি হয় বর্তমান চিত্র, তাহলে ধরে নেয়া যায় আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এই বিরাট জনগোষ্ঠী হয়তো বাহ্যিক কারণেই কর্মক্ষমতা হারাবে এবং আমরা তাকে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে খরচের খাতায় ফেলে দেব, যেমনটা ঘটছে ফার্মগেটের ওই বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে। এঁদের দেখাশোনার ভার যদি তখন কেবল তাদের সন্তানদের ওপর বর্তায়, তবে হলফ করে বলতে পারি, তাদের অবস্থা কি ফার্মগেটের ওই বৃদ্ধাদের মতো হবে না?

আজ যারা কর্মক্ষম হিসেবে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়ার কোনো সুযোগ সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কারোর আছে?

২০১৩ সালে সরকার পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিষয়ক একটি আইন পাস করেছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল এবং তা শুদ্ধ করবারও যথেষ্ট সুযোগ আছে। যতটুকু হয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কিন্তু এর ব্যবহার কিভাবে নিশ্চিত হবে?

আমার জানা নেই, ২০১৩ সালে আইনটি পাস হবার পর অদ্যাবধি কতটি অভিযোগ হয়েছে। আমার মনে হয়, আমরা জাতিগতভাবেই কিছুটা অভিমানী। আমরা ভাঙবো কিন্তু মচকাবো না। নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানের ভালো চাইব। এ আইনটি সমাজ শুদ্ধিকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণমাত্র, যার সঠিক ব্যবহার এনে দিতে পারে প্রত্যাশিত পরিবর্তন। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে থাকবে সন্তানদের মূল্যবোধ শিক্ষা, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ (যেমন- স্বাস্থ্যবীমা, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি), বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রয়োজনে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি।

বৃদ্ধাশ্রমকে আবারো গুরুত্বের সাথে বলছি এ কারণে যে, সব ধরনের উদ্যোগের পরও কিছুসংখ্যক মানুষ থাকে, যাদের আসলে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নাই। কিন্তু তারা তো এই বাংলা মায়েরই সন্তান। মায়ের সকল সন্তানই যেন থাকে দুধে-ভাতে এই তো চাওয়া। আসুন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভাবি, আমরা কি আমাদের পিতা-মাতার সাথে গ্রহণযোগ্য আচরণ করছি?

মনে রাখতে হবে, বাবা-মা তার সন্তানকে ক্ষমা করলেও প্রকৃতি অনেক রূঢ়। সে তার কোনো সন্তানের অপমান-অবহেলা সইবে না। আমার কৃতকর্মের ফল আমাকে ভোগ করতেই হবে।

তাই মনে হচ্ছে, কুড়িতেই বুড়ি আর সঙ্গত কারণেই আমি তেত্রিশেই যেন অশীতিপর বৃদ্ধা।

লেখক : উন্নয়ন কর্মী

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category