,

রেলে ‘বাঁশ’ কেন?

রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধাদিসহ বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করে ব্রিটিশ সরকার এ অঞ্চলে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু করে। এরপর বাংলা ভাগ হল, ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান সরকার গেল, বাংলাদেশ স্বাধীন হল, স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশতক কেটে গেল, সরকারের পর সরকার বদলে গেল, কালো বিড়াল ধরা পড়ল, দফায় দফায় রেলের ভাড়া বাড়ল; কিন্তু রেলওয়ে খাত লাভের মুখ দেখলোনা।

কয়েকদিন  আগে  গনমাধ্যমে  ‘রেললাইনে লোহার বদলে দেয়া হয়েছে বাঁশ’ প্রতিবেদন নিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল । একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখলে দেখা যাবে যে,  শুরুর পর থেকেই শুধু রেললাইনে নয় পুরো রেল ব্যবস্থাতেই যেন ‘বাঁশ’ দেয়া হয়েছে। আগে থেকেই বলে রাখি যে, এই বাঁশ দিয়ে মূলত রেলওয়ের অনিয়ম,অব্যবস্থাপনাকেই নির্দেশ করা হয়েছে। পাঠক এখন নিশ্চয় ‘বাঁশ’ বিষয়ে পরিস্কার ধারণা লাভ করেছেন।

যাত্রী সেবার মান ও রাজস্ব আয় না বাড়লেও বছর বছর লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে রেলওয়ের পরিচালন ব্যয়। আয়ের চেয়ে অধিক ব্যয়ের কারণে ভারী হচ্ছে লোকসানের পাল্লা।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৮৭৭ কিঃমিঃ রেল লাইন নেটওয়ার্ক দেশের ৪৪ টি জেলায় সংযুক্ত। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রেলপথ বিভাগ নামে নতুন বিভাগ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আইন/২০১১ অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুয়ায়ী প্রতি বছর রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লোকসান দেয়। এক হিসেবে দেখা যায়, রেলওয়ে গত ৫ বছরে লোকসান দিয়েছে ৪ হাজার ২৩১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালেই প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যায় হয়েছিল। ২০০০-২০১২ পর্যন্ত রেলওয়ের লোকসান হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৭৩ কোটি ৩ লাখ টাকা।

দিন পাল্টেছে; এখন রেলওয়ে যাত্রীরা টিকেট কেটে ট্রেনে ভ্রমন করতে চান। অপরদিকে, যাত্রীরা টিকিট নিতে চাইলেও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অসাধু পুলিশ ও আনসার, গার্ড বিনা টিকিটে ট্রেনে যাত্রী উঠিয়ে নেয় এবং যাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ভাড়া আদায় করে। যে কারণে রেলের টিকিট তুলনামূলক কম বিক্রি হচ্ছে।

রেলওয়েতে নিয়োগ বাণিজ্যের কথা দেশের মানুষ কমবেশি জানেন; জানেন রেলওয়ের বড়কর্তা পর্যন্ত। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একেকটি পদে নিয়োগে ঘুষের নিলাম উঠে প্রায় চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত। সাধারণ, পোষ্য, মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী সকল কোটাতেই এই ঘুষ বাণিজ্যের দৌড় রয়েছে।

রেলগাড়ির তেল চুরি, পুরনো ইঞ্জিন মেরামত, টেন্ডারবাজি, ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতকরাসহ বিভিন্ন কারণেই সরকারকে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আর লোকসান গুনছে রেলওয়ে।

কিছুদিন আগেই একটি দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন থেকে বছরে প্রায় শতকোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। চলন্ত ট্রেন, ইঞ্জিন, পাওয়ার কার এবং লোকো শেড থেকে এ চুরির ঘটনা ঘটছে। শতাধিক সিন্ডিকেট এ কাজের সঙ্গে জড়িত।

অনেকেই বলছেন কৃত্রিমভাবে রেলে লোকসান দেখিয়ে ভাড়া বৃদ্ধি, রেল ও রেলের সম্পদ লুটপাটের এক বড় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। চুরি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার খেসারত হিসেবে ২০১২ সালে ও ২০১৬ সালে ভাড়া বেড়েছে।

অপরদিকে ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে  শীতপ্রধান দেশের উপযোগী ডেমু ট্রেন এখন যেন আরেক দুর্ভোগের কারণ হয়ে গেছে। অন্য ট্রেনের তুলনায় কম ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বাংলাদেশের অবকাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি বেমানান বলে দুর্ঘটনার আশংকা থেকেই যায়।

রেললাইনে লোহার বদলে বাঁশ, টিকিট কালোবাজারি, রেলের জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পুরনো আমলের স্টেশন, পুরোনো সিগন্যাল ব্যবস্থা, অরক্ষিত রেল ক্রসিং এসব সমস্যার কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। সড়কপথের মত রেলপথের নির্মাণ ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

এত অনিয়ম বিদ্যমান রেখেও রেলওয়ে খাত লাভের মুখ কবে নাগাদ দেখতে পাবে সে বিষয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ থেকে যায়। তবে রেলওয়ে ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে, সকল অনিয়ম, লুটপাট বন্ধ করে রেলওয়ে খাতকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জনগণকে সাথে নিয়ে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা এক কালো বিড়ালের পর রেলওয়ে আরেক কালো বিড়ালের থাবায় বন্দী হবে, যার কুফল ভোগ করবে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের মানুষ। তখন রেললাইনে লোহার বদলে ‘বাঁশ’   দেখেও আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকবেনা।

——————–

লেখক : রকিবুল সুলভ

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category