,

২১ জানুয়ারি সাগরদাঁড়িতে মধুমেলা শুরু

যশোর প্রতিনিধিঃ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবক্তা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৩ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা শুরু হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। যশোরের কেশবপুরের কপোতাক্ষ পাড়ের তীর্থভূমি সাগরদাঁড়িতে ওই দিন বিকেল ৩টায় মেলার উদ্বোধন করবেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক।

মেলাকে ঘিরে মধুভক্তদের মাঝে ইতিমধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

২৭ জানুয়ারি মধুমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি দু’জন গুনী ব্যক্তির হাতে মধুসূদন দত্ত স্বর্ণপদক-২০১৭ তুলে দেবেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব শরীফ রায়হান কবীর জানান, মহাকবির জন্মদিন ২৫ জানুয়ারি। তবে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কারণে ২১ জানুয়ারি থেকে মেলা শুরু করতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, জোরে সোরে চলছে মেলার শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন থেকেই প্রতিদিনই বিকেল ৩টা থেকে মধুমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। মধুসূদনের সৃষ্টি, সাহিত্য ও কর্মজীবনের ওপর বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেবেন দেশের বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। আলোচনা সভা শেষে একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন দলগত সংগীতানুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পীরা এখানে সংগীত পরিবেশন করবেন। প্রতিবারের ন্যায় মেলায় আগতদের মাঝে মেলা আকর্ষণীয় করে তুলতে মেলার মাঠে কৃষি মেলার প্রদর্শনী, যাত্রা, সার্কাস, ইঞ্জিন ট্রেন, যাদু, পুতুল নাচ ও ভ্যারাইটি শো’র ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রতিবারের ন্যায় সরকার টেন্ডারের মাধ্যমে মেলার ইজারা দিয়েছে আয়োজক কর্তপক্ষ। প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে মেলার মাঠ ইজারা পেয়েছেন যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল।

‘৮০ দশকে মধু কবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়ির ‘পৈত্রিক বসতবাড়ি’ প্রত্বতত্ত্ব অধিদফতর সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পরে কিছুটা ঘষামাজা করে পুরাতন জীর্ণশীর্ণ ভগ্নদশা থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে কবির জন্মজয়ন্তী ও মধুমেলা উদ্বোধন কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাগরদাঁড়িতে পর্যটন কেন্দ্র ও মধুপল্লী গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। যার প্রেক্ষিতে পর্যটনের ১টি রেঁস্তোরাসহ কেন্দ্র ও মধুপল্লী নির্মাণ করা হয়। তবে ভ্রমণ পিপাসু ও পর্যটকদের জন্য এখানে গড়ে উঠেনি বিশ্রামাগার ও অন্য সুযোগ সুবিধা।

যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, প্রাণের কবি, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক আধুনিক বাংলা কাব্যের রূপকার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সাগরদাঁড়ি গ্রামের স্থানীয় জমিদার পিতা রাজনারায়ন দত্ত আর মাতা জাহ্নবী দেবীর কোল আলোকিত করে সোনার চামচ মুখে নিয়ে বাঙালির প্রিয় কবি এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। প্রাকৃতিক অপূর্ব লীলাভূমি, পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা, শষ্য সম্ভারে সম্বৃদ্ধ সাগরদাঁড়ি গ্রাম আর বাড়ির পাশে বয়ে চলা স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষের সাথে মিলেমিশে তার সুধা পান করে শিশু মধুসূদন ধীরে ধীরে শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে পরিণত যুবক হয়ে উঠেন। কপোতাক্ষ নদ আর মধুসূদন দু’জনার মধ্যে গড়ে উঠে ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। মধুকবি ১৮২৪ সালে যখন জন্মগ্রহণ করেন সে সময়ে আজকের এই মৃত প্রায় কপোতাক্ষ নদ কাকের কালো চোখের মত স্বচ্ছ জলে কানায় কানায় পূর্ণ আর হরদম জোয়ার ভাটায় ছিল পূর্ণযৌবনা। নদের প্রশস্ত বুক চিরে ভেসে যেত পাল তোলা সারি সারি নৌকার বহর আর মাঝির কণ্ঠে শোনা যেত হরেক রকম প্রাণ উজাড় করা ভাটিয়ালী ও মুর্শিদি গান। শিশু মধুসূদন এসব অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখতেন আর মুগ্ধ হতেন। স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষের অবিশ্রান্ত ধারায় বয়ে চলা জলকে মায়ের দুধের সাথে তুলনা করে কবি রচনা করেন সেই বিখ্যাত সনেট কবিতা ‘কপোতাক্ষ নদ’। ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমারি কথা ভাবি এ বিরলে’।

ছেলেবেলায় নিজ গ্রামের এক পাঠশালায় মাওলানা লুৎফর রহমানের কাছে শিশু মধুসূদন তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পাশাপাশি গৃহ শিক্ষক হরলাল রায়ের কাছে বাংলা ও ফারসি ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু গায়ের পাঠশালায় তিনি বেশি দিন শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। আইনজীবী বাবা রাজনারায়ন দত্ত কর্মের জন্য পরিবার নিয়ে কলকাতার খিদিরপুরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এখান থেকে ইংরেজি ভাষার প্রতি দুর্বল হয়ে পাড়ি জমান পশ্চিমা দেশ ফ্রান্সে। অবস্থান করেন ভার্সাই নগরীতে। বিদেশি ভাষায় জ্ঞানার্জন করার পাশাপাশি ওখানে বসেই তিনি রচনা করেন বাংলায় সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। সেখানে চলাফেরার এক পর্যায়ে মধুসূদন পর্যায়ক্রমে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

শেষ জীবনে অর্থাভাব, ঋণগ্রস্থ ও অসুস্থতায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ফিরে আসেন আবারো কলকাতায়। এসময় তার পাশে ২য় স্ত্রী ফরাসি নাগরিক হেনরিয়েটা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। এরপর সকল চাওয়া পাওয়াসহ সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার একটি হাসপাতালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মহাকবির মৃত্যুর পর ১৮৯০ সালে কবির ভাইয়ের মেয়ে মানকুমারি বসু সাগরদাঁড়িতে প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করেন। সেই থেকে শুরু হয় মধুজন্মজয়ন্তী ও মধুমেলার।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category