,

ফিরতে পারেননি মুক্তিযোদ্ধা বনি

স্পেশাল টিম: ১৯৭১ সালে সৈয়দ শফিকুর রহমান বনির বয়স মাত্র ১৭ বছর। বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজধানীর পলাশী ব্যারাকে থাকতেন। ক’দিন পরেই ছিল তার ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষা।

কিন্তু ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিশোর বনি সিদ্ধান্ত নেন আগে দেশ রক্ষা, পরে পরীক্ষা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধে যান তিনি। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাডুবিতে মারা যান।

তাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন এন্ড আরবান সেফটি (জিডপাস) ভবনের বাঁ পাশে দাফন করা হয়। কিন্তু তার কবরটি পড়ে আছে অবহেলায়। অনেক নিচু জায়গায় এবং কবরের দেয়াল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট। এ জন্য বিভিন্ন প্রাণী কবরে প্রবেশ করে। এ ছাড়া বৃষ্টি হলে তার কবরটি পানিতে ডুবে যায়। বুধবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ শফিকুর রহমান বনির কবরের সামনে গিয়ে এ দৃশ্য চোখে পড়ে।

এদিকে গত রোববার কবরের সামনে জঙ্গল দেখা গেছে। কবরে নামফলক ভাঙা এবং তা দীর্ঘদিন ঠিক করা হয়নি। কিন্তু বুধবার গিয়ে দেখা গেছে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়েছে, কবর সংস্কার করা হয়েছে। কবরের নামফলকে লেখা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ শফিকুর রহমান বনি, পিতা: মরহুম সৈয়দ মুহম্মদ আলী, গ্রাম: কাঠুহুগলি, জেলা: ফরিদপুর। ৩৩/১ পলাশী ব্যারাক। জন্ম: ১২-০১-১৯৫৪, মৃত্যু: ১৬-১২-১৯৭১।

অনেকেই তার কবর দেখতে আসেন এবং জিয়ারত করেন। বুধবার কবর দেখতে আসেন মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ শফিকুর রহমানের (বনি) খালাতো ভাই মো. রফিকুল ইসলাম মোহন। বনির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কান্না শুরু করেন। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘বনি, সাজ্জাদ, গোলাম মর্তুজা, তোফাজ্জল হোসেনসহ অনেকে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ভারতে যান। আগরতলার মেলাঘর ও অম্পিনগরে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেন। ট্রেনিং শেষে ২ নম্বর সেক্টরে যুক্ত হন। বনিকে যুদ্ধের জন্য ঢাকার লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, কোরানীগঞ্জ এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এখানে কমান্ডার মোশাররফ হোসেনের (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী) নেতৃত্বে অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। শহীদ বনি, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা একসঙ্গে যুদ্ধ করেছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধক্ষেত্র কামরাঙ্গীরচর থেকে ফেরার পথে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবে যায় এবং বনি ও আরো ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান।’

তিনি বলেন, ‘বনি তার মায়ের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার কথা বললে মা পরীক্ষা দিতে বলেন। বাবার কাছে এ কথা বলার সাহস পেলেন না। তাই বাবা-মাকে কিছু না বলে চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার (বর্তমানে শরীয়তপুর জেলা) কাঠুহুগলী গ্রামে। চাচাতো ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি দিয়ে বলেন, ‘এ চিঠি আম্মা-আব্বার কাছে পৌঁছে দেবেন। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবেন, বনি যুদ্ধ করতে গেছেন। দেশ স্বাধীন করেই বাসায় ফিরবেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে। আগে দেশ রক্ষা, পরে পরীক্ষা। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বাবা-মার কাছে ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন বনিও। তবে জীবিত নয়, শহীদ হয়ে।’

কথা হয় বনির ভাই মো. মতিউর রহমানের সঙ্গে। ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে তার অশ্রু ঝরতে থাকে। চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। ১৬ ডিসেম্বর নৌকায় ঢাকায় ফেরার সময় বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাডুবিতে মারা যান। তাকে পলাশী নিয়ে আসা হলে এলাকাবাসী বলেন, ‘বনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তাকে এখানে কবর দেওয়া হবে। এলাকাবাসীর কথায় পলাশী ব্যারাকের সামনে কবর দেওয়া হয়। সরকার এ জায়গাটি বুয়েটকে দিয়ে দিয়েছে। বুয়েটের জায়গায় মাটি ভরাট করা হলেও কবরের অংশটিতে মাটি ভরাট করা হয়নি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরটি অনেক নিচুতে রয়ে গেছে।’

কবরটির যত্ন এবং তদারকির বিষয়ে জানতে বুয়েটের উপ-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল জলিল সরদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে বুয়েটের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌম মানচিত্রের জন্য তারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বনি একজন। বুয়েটে তার কবর রয়েছে। তার কবরের চারপাশ সংস্কার করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কাজ শুরুও হয়েছে, দ্রুত কাজ শেষ হবে।’

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category