,

সেদিন পিছু ফেরার পথ ছিলো না

প্যারী সুন্দরী স্পেশাল টিম: ১৯৭১ সালে আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। রাজনীতি সম্পর্কে তেমন কোন ধ্যান ধারনা ছিলো না। লোকমুখে শুনতাম পাকিস্থানী সেনারা পূর্ব পাকিস্থানে ভরে গেছে, সব বাঙ্গালীকে মেরে ফেলবে। খুব ভয় পেতাম। মাঝে মধ্যে পাকিস্থানী সৈন্যরা গ্রামে ঢুকতো। সবাই পালাও পালাও করতো। ঘর বাড়ী সব ফেলে মা, ভাই-বোনদের নিয়ে নদী পার হয়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতাম।
এভাবেই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই দিনের স্মৃতির কথা তুলে ধরলেন প্যারী সুন্দরী অনলাইনের কাছে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মহদীপুর গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ।
একদিন শুনলাম কুষ্টিয়া শহরে পাকিস্থানী সৈন্যরা এসে গেছে, তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। এলাকার ধনী ব্যক্তিদের যার যার বাড়ীতে বন্দুক রয়েছে সেগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে। আনছার ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করে তাদের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া হচ্ছে। পরদিন সব তৈরী হয়ে ট্রাক বোঝায় করে কুষ্টিয়ার অভিমুখে রওনা হলো। আমাদের মতো কিছু ছাত্রও তাদের সাহায্যের জন্য যেতে হলো। ভোর রাতে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন ঘেরাও হলো। তখন দেখলাম ইপিআর পুলিশ আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তাদের দেখে আমাদের সাহস আরো বেড়ে গেলো। সেদিন ভোর রাত থেকেই শুরু হলো যুদ্ধ। বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ হতে লাগলো। বিকাল পর্যন্ত একটানা যুদ্ধ হয়ে পরে শেষ হলো। সেই যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছিলাম।

বাড়ী ফিরে পরদিন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য আমার বাবা এবং আমি নৌকা করে ভারতের করিমপুর ক্যাম্পে গেলাম। ভর্তি হলাম সেখানে। তারপর সাতদিন পরে সেখান থেকে চলে গেলাম জামসেদপুর ক্যাম্পে। সেখান থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্য বিহারের চাকুলিয়া হয়ে শিকারপুর এ্যাকশন ক্যাম্পে থেকে হাতিয়ার নিয়ে চলে এলাম দেশে। শুরু হলো ভয়াবহ দুঃসহ জীবন। রাতে ঘুম নেয়, খাওয়া নেয়, নেই বিশ্রাম। রাত হলেই বিভিন্ন স্থানে অপারেশন। রাজাকার ধরা আর মারা আমাদের ছিলো নিত্য দিনের সুচি। যেহেতু আমরা গেরিলা হিসাবে প্রশিক্ষন নিয়েছিলাম, সেহেতু সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আমরা নই। তবে শেষের দিকে ২৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালের রাতে একজন রাজাকারকে ধরার জন্য তার বাড়ী হানা দিয়েছিলাম।

তাকে ধরে নিয়ে পাহাড়পুর গ্রামে নিয়ে আসলাম। কিন্তু তারপরে আমাদের সঙ্গিয় কাউকে তখন পাশে পায়নি। কারন সেদিন দুপুরে পিছ কমিটির দুইজনকে ধরে বেধে রাখা হয়েছিলো। তাদের ব্রাশ ফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো এই খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার কারনে সেদিন আমাদের সঙ্গিয় যোদ্ধাদের আত্মগোপন করতে হয়েছিলো। খোজ নিয়ে জানতে পারলাম তারা শেরপুর গ্রামে রয়েছে। রাতে পৌছালাম তাদের কাছে। এর মধ্যে কয়েকজন লোক এসে আমাদের বললো ভাই আমাদের এলাকায় কয়েকজন রাজাকার এসে আমাদের মা বোনদের অত্যাচার করছে। খবরটা শোনা মাত্র মাথার রক্ত গরম হয়ে গেলো। বিশ্রাম নেওয়া হলো না। ছুটলাম তাদের নিয়ে। আমরা বেশ কয়েকজন মিলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললাম সেই পাড়াটা।

ভোর রাতের আযানের পর পর একসাথে কয়েকজন ফাঁয়ার দিলাম। কিন্তু অবস্থা দেখলাম বেগতিক। তারা সংখ্যায় প্রায় ৮০-৯০জন ছিলো। ৮০-৯০জন পাকিস্থানী সৈন্য আর তাদের হাতে ভালো ভালো হাতিয়ার। সেই সময় আমাদের পিছু ফেরার পথ ছিলো না। হয় মারো, নয়তো মরো। তখন আমরা সবাই জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধে মনোযোগ দিলাম। নিজে মরলে সাথে পাকিস্থানীদের নিয়েই মরবো। শুরু হলো বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষন। কারো দিকে দেখার সময় নাই। বেঁচে আছি কি মরে গেছি তা ভাবার সময় ছিলো না কারো। আমাদের সবার লক্ষ্য ছিলো পাকিস্থানীদের মারা।

ভোররাত থেকে একটানা দুপুর পর্যন্ত সেদিন চললো গুলাগুলি। তারপর হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেলো গুলাগুলি। দেখাগেলো সামনে অনেক লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। কিছু রাজাকার একটা বড় বটগাছের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে এমটা জানতে পারলাম আমরা। সেই গাছের দিকে নিশানা করে কিছুক্ষন ব্রাশ ফায়ার দিলাম। তারপর তারা গাছের ভেতর থেকে বেরিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শুরু করলো আবার গুলাগুলি। তখন আমাদের বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। সেদিন আমাদের ১০-১২ জন আহত হয় এবং একজন শহীদ হয়।
মহান এই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে স্বরণীয় ঘটনা হলো আমরা যে হাতদিয়ে পাকিস্থানীদের হত্যা করতাম আবার সেই হাতদিয়েই আমাদের সহযোগীদের সেবা করতাম। দেখেছি হাজারো মানুষকে মরতে। পেরেছি শত্রুতের মারতে। দেখেছি মেয়েদের আহাজারি। তারা আমার আপন কেউ ছিলো না, তবে সেদিন মনে হয়েছিলো এরা সকলেই আমাদের আপনজন। এমন নির্মমভাবে মা-বোনদের হত্যা করা হয়েছিলো তা দেখে আমাদের যুদ্ধের অনুপ্রেরনা আরো বেড়ে গিয়েছিলো। আমাদের আত্মবিশ্বাস আর সাধারন মানুষের কষ্টের আহাজারি আমাদের দেশকে স্বাধীন করতে সাহায্য করেছিলো।
সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা আমার আজো কানে বাজে। মা-বোনদের আহাজারি, শিশুর কান্না আজো আমার মনে পড়ে।
আমি মনে করি এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সেদিনের শত্রু রাজাকার ও তাদের সহযোগিদের বিচার করে তাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হোক। এতে সেদিনের শহিদদের আত্মার শান্তি পাবে। এদেশ একেবারে রাজাকার মুক্ত হবে।


মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বীর মুক্তিযোদ্ধারের কথা নিয়ে প্যারীসুন্দরী ডটকমের বিশেষ আয়োজন “আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ”। 

রিপোর্ট: প্যারীসুন্দরী স্পেশাল টিম


Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category