,

বধ্যভূমি আছে নেই স্মৃতিস্তম্ভ নেই শহীদের তালিকা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও পাক হানাদারদের গণহত্যা বাঙালির ইতিহাসে দগদগে ঘা হয়ে আছে। একাত্তর সালের সেই গণহত্যার কথা মনে হলেই চোখে ভেসে ওঠে খান সেনাদের বর্বরতা ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা।

সেদিন তারা বাঙালির রক্ত ঝরিয়েছে পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু পারেনি, বরং সেই রক্তই হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রেরণার উৎস। আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ। আর সেই প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়েই ১৯৯৯ সালে গাইবান্ধায় জরিপ চালিয়ে ২৮টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করেছে বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণ কমিটি।

বধ্যভূমিগুলো হলো সদরের স্টেডিয়ামসংলগ্ন বধ্যভূমি (শাহ কফিল উদ্দিন), কামারজানি বধ্যভূমি, নান্দিনা গণকবর, পলাশবাড়ী সড়কের বিসিকের সামনে গণকবর, সাদুল্যাপুর রোডের ডান পাশে গণকবর, ফুলছড়ি বধ্যভূমি, কাইয়ারহাট বধ্যভূমি, উদাখালী সরদারপাড়া গণকবর, সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি (থানা সদরের শহীদ মিনার), লালচামার বধ্যভূমি, কামারপাড়া-বামনডাঙ্গা রেল সড়কের পাশে গণকবর, সাঘাটা হাইস্কুলের সামনে ওয়াপদা বাঁধের পাশের বধ্যভূমি, বোনারপাড়া লোকোশেড হত্যাকাণ্ড, বোনারপাড়া বিএডিসি তেলের ট্যাংকের পাশে বধ্যভূমি, বোনারপাড়া কেজি স্কুলের পাশে গণকবর, বোনারপাড়া কলেজের পাশে গণকবর, সুজালপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠের বধ্যভূমি (কামালের পাড়া ইউনিয়ন), মুক্তিনগর গণকবর, দলদলিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর, পলাশবাড়ী উপজেলার সড়ক ও জনপথ বিভাগ বধ্যভূমি, কাশিয়াবাড়ী বধ্যভূমি, মুংলিশপুর জাফর গণকবর, খায়রুলের দিঘীরপাড় গণকবর, পলাশবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে গণকবর, কাটাখালি বধ্যভূমি, পাখেরা গ্রামের গণকবর, মালঞ্চ প্রাইমারি স্কুল গণকবর ও মহিমাগঞ্জ সুপার মিল গণকবর।

এর মধ্যে জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী বধ্যভূমি (পশ্চিম রামচন্দ্রপুর) মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার  সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানেই সংঘটিত হয়েছিল নির্মম এক হত্যাকাণ্ড। ১৯৭১ সালের ১১ জুন পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা মিলে এখানে হত্যা করে  দেড় শতাধিক মুক্তিকামী মানুষকে। তাদের স্মরণে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোর কথা।

সেদিন লাশের স্তুপের মধ্যে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন সাগের আলী নামের এক ব্যক্তি। এখন তার বয়স ৭৩। রাজাকারের দা’য়ের কোপের আঘাত এখনো তার ঘাড়ে জ্বল জ্বল করছে। তার বাড়ি উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের চকবালা গ্রামে।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে সাগের আলী ছাড়াও রামচন্দ্রপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়স্ক গোপাল চন্দ্র মোহন্ত ও ৮০ বছর বয়স্ক মকবুল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মুখে কাশিয়াবাড়ীর হত্যা ও নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আজো গা-শিউরে ওঠে।

সেদিনের লোমহর্ষক ঘটনার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে সাগের আলী বলেন, ‘একাত্তরে আমার বয়স ছিল ২৬-২৭। ঘাতকরা মুক্তিকামী সব মানুষকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দিচ্ছিল ডোবায়। এক সময় আসে আমার পালা। রাজাকার রমজান আমার ঘাড়ে দা দিয়ে কোপ দিয়ে লাথি মেরে ডোবায় লাশের স্তুপে ফেলে দেয়। দায়ের কোপ ঠিকমতো না লাগায় প্রাণে বেঁচে যাই। তবে মরার মতো পড়ে থাকি ওরা সবাই চলে না যাওয়া পর্যন্ত। এরপর লাশ সরিয়ে উঠে দাঁড়াই। তখনও রক্ত ঝরছিল শরীর থেকে। এরপর অনেক কষ্ট করে পাটখেতের আড়াল দিয়ে বাড়িতে পৌঁছেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে দীর্ঘদিনের সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে ওঠি।’

জেলা বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক জি এম চৌধুরী মিঠু জানান, খান সেনাদের ছত্রছায়ায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কুখ্যাত রাজাকার রমজান আলী ও হানিফ মাওলানা ধারালো অস্ত্র দিয়ে অনেক মানুষকে গলাকেটে ও গুলি করে হত্যা করে। সেদিন অসংখ্য নারীকেও গণধর্ষণ করা হয়। তাদের মধ্যে পাশবিক নির্যাতনের পর গিরিবালা ও ফুলবানু নামের দুই নারীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

৭১ সালের ১১ জুন শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েই হানাদারের হাতে ধরা পড়েন সাগের আলী। তিনি জানতেন না যে, আগের রাতেই কাশিয়াবাড়ী এলাকায় কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছিল।

সেদিনের চিত্র সম্পর্কে সাগের আলী বলেন, ভোর থেকেই ধরা হচ্ছিল এলাকার মানুষজনকে। এরপর তাদের জড়ো করা হয় কাশিয়াবাড়ী স্কুলমাঠে। নারী-পুরুষ ছোট-বড় কেউ বাদ যায়নি। পাশের জেলা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থেকেও আসে একদল পাকিস্তানি সেনা। আর বিহারি রমজান আলী ও হানিফ মাওলানার সহায়তায় পাকসেনারা কাশিয়াবাড়ী প্রাইমারি স্কুলে বাঙালি নারীদের আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালায়।

অন্যদিকে তখন স্কুলমাঠে চলছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সমর্থক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বাছাই করার কাজ। বন্দিদের পরনের প্যান্ট, লুঙ্গি খুলে তারা দেখে খৎনা হয়নি কার কার।

হিন্দু হওয়ার পরও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান পশ্চিম রামচন্দ্রপুরের গোপীরঞ্জন সরকার। বর্তমানে পল্লী চিকিৎসক গোপীরঞ্জন তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়তেন।

গোপী রঞ্জন জানান, বয়স কম বলেই তার বেলায় এসে ওই পদ্ধতিতে বাছাই করা সম্ভব হয়নি। একই কারণে বেঁচে যান গোপীরঞ্জনের সহপাঠী কাশিয়াবাড়ী হাই স্কুলের প্রাক্তন করণিক আনিছার রহমান বাদশা (বর্তমানে মৃত) ও স্থানীয় পোস্ট অফিসের দায়িত্বরত পিয়ন আমির আলী।

তবে বিনা খাটনিতে ছাড় দেওয়া হয়নি তাদের। তাদেরকে দেওয়া হয় হানাদারের লুট করা গরু ছাগল করতোয়া নদী পার করে পাকসেনা ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়ার কাজ।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পল্লী চিকিৎসক গোপীরঞ্জন সরকার জানান, বাছাই করা দেড় শতাধিক মানুষকে আলাদা করে রশি দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয়। তাদের বসানো হয় রামচন্দ্রপুর গ্রামের একটি ডোবার ধারে। এরপর তাদের গলা কাটতে থাকে রমজান আলী ও হানিফ মাওলানা। ৫/৬ জনকে হত্যার পর হাতবাঁধা অসহায় মানুষগুলো প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। এ সময় হানাদাররা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো শুরু করে।বহু লাশ পড়ে সেদিন।

সেদিনের নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের শিকার যাদের নাম জানা গেছে, তারা হচ্ছেন কাশিয়াবাড়ী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সপ্তনা গ্রামের হারেছ আলী মন্ডল, কাশিয়াবাড়ীর আমানউল্লাহ মন্ডল, রাম বল্লভ কর্মকার, নজির উদ্দিন, বাহার উদ্দিন, আনছার আলী, বাজেন্দ্র নাথ শীল, আকালু শেখ, রামচন্দ্রপুরের বিনোদ বিহারি, কিশোরগাড়ীর শিক্ষক গোলজার রহমান, রামচন্দ্রপুরের অতুল চন্দ্র, কুমোদ চন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্র নাথ, উপেন্দ্রনাথ, ক্ষুদিরাম, গৌরহরি, নরেন্দ্র নাথ, সীতারাম, চেংটু মন্ডল, কালু দাস, গাদু সরকার, হায়দার আলী, মহিন্দ্র নাথ দাস, মুকন্দ শীল, বালু রাম দাস, পবনাপুরের রমেশ চন্দ্র সরকার, মহিন্দ্র নাথ সরকার, গগন চন্দ্র দাস প্রমুখ।

জেলা বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক জি এম চৌধুরী মিঠু জানান, গাইবান্ধা সদরসহ ৭ উপজেলার ২৮টি বধ্যভূমির মধ্যে চারটিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। বাকিগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সাইনবোর্ড লাগনো হয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে পারে, সেজন্য সব বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, শহীদদের নামের তালিকা টাঙানোসহ সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

 

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category