,

মনের আলোয় চার-ছক্কা

খেলা ডেক্সঃ মাঠের চারপাশে ফিল্ডার। প্রস্তুত ব্যাটসম্যান। অপর প্রান্ত থেকে বোলার ক্রিজে বল ফেলতেই ব্যাটসম্যানের সজোরে শট। পয়েন্ট দিয়ে মুহূর্তেই বল সীমানার বাইরে। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোচ চিৎকার করে উঠলেন, ‘গুড শট’।

আপাতদৃষ্টিতে এটি ক্রিকেট ম্যাচের দৃশ্য। ঠিক তাই। এ আর এমন কী, মাঠে কিংবা অলিগলিতে প্রতিদিনই তো ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। এ নিয়ে কেন মাতামাতি? এর কারণ একটাই—আর দশজনের মতো নন এঁরা। এই ম্যাচের খেলোয়াড়েরা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চোখের আলো নেই, তবু দমে যাননি তাঁরা।

সম্প্রতি এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে গেলে চোখে পড়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অনুশীলন। তখন তাঁরা দুটি দলে ভাগ হয়ে খেলছিলেন। দলটির নাম ‘চিটাগং ডিজঅ্যাবেল স্পোর্টিং ক্লাব’।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা নিজেদের তৈরি করছেন আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট লিগ সামনে রেখে। আগামী ৭ থেকে ১০ ডিসেম্বর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হবে লিগের খেলা। লিগ কাছে চলে আসায় এখন নিয়মিত অনুশীলনে ব্যস্ত তাঁরা। এরপর আগামী জানুয়ারিতে ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিশ্বকাপ ক্রিকেট। দুটি টুর্নামেন্ট সামনে রেখে চলছে তাঁদের নিবিড় অনুশীলন। এর মধ্যে ১২ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলা দল কক্সবাজার গিয়ে অনুশীলন ম্যাচে কক্সবাজার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলকে হারিয়ে এসেছে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দলের ম্যানেজার সোলায়মান বাদশা বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি দেশকে কিছু দিতে। আগামী মাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠেয় জেলা টুর্নামেন্ট এবং পরের মাসে ক্রিকেট বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখন অনুশীলন করছি।’

চট্টগ্রামের এই ক্রিকেট দলটির অর্জনের ভান্ডার কিন্তু কম নয়। গত বছর সারা দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলগুলোর মধ্যে আয়োজিত টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় দলটি। রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত ওই টুর্নামেন্টে রানারআপ হয় যশোর।

দলের বেশির ভাগ সদস্যই শিক্ষার্থী। দলটির পাঁচজন চোখে একেবারেই দেখেন না। ৫ মিটার পর্যন্ত দেখতে পান চারজন। বাকি পাঁচজন দেখতে পান ১৫ মিটার পর্যন্ত। এই দলে জাতীয় দলের দুজন ক্রিকেটারও রয়েছেন। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজিলুর রহমান ও চাকরিজীবী রিপন বড়ুয়া।

জন্মান্ধ তানজিলুর রহমান ‘চিটাগং ডিসঅ্যাবেল স্পোর্টিং’ ক্লাব দলের অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখে দৃষ্টি নেই। তবু মনের জোরে আমরা সবকিছু করি। ক্রিকেট খেলে আনন্দ পাই। সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দলের সাফল্য আসে।’

তানজিল ২০১২ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নেন। রিপন ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ত্রিবঙ্গীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নেন। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়। অন্য দিকে রিপন ছোটবেলায় অসুখে পড়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। চাকরির পাশাপাশি ক্রিকেটটাও খেলে যাচ্ছেন। ক্রিকেটের জন্য কখনো ঢাকা কখনো কক্সবাজার যাচ্ছেন। রিপন বলেন, ‘ক্রিকেটে আনন্দ পাই। আমার স্বপ্ন বাংলাদেশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করানো। সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে করে সিঁড়ি পার হচ্ছি।’ চট্টগ্রামের দলটির ওপেনার ব্যাটসম্যান আরিফুল ইসলাম কক্সবাজারের সঙ্গে অনুশীলন ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়েছেন। তিনিও চাকরিজীবী।

এ দুজন ছাড়া অন্যরা হলেন চট্টগ্রাম িবশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোহাম্মদ শাহজাহান ও আবু সাহেদ, পলিটেকনিকের ছাত্র আফতাবুল ইসলাম ও মোহাম্মদ শরীফ, ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র েমাহাম্মদ সাকিব ও মোহাম্মদ মানিক, চাকরিজীবী মোহাম্মদ মহিউিদ্দন ও হাবিবুল্লাহ, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা মোহাম্মদ রায়হানুল, উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র আল আমীন এবং সর্বকনিষ্ঠ সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া মোহাম্মদ তৌকির।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের কোচ মো. শরীফ হোসেন বলেন, ‘অনেক দিন ধরে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ইতিমধ্যে অনেক সাফল্যও এসেছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা খেলাটা খেলে যাচ্ছে, এটা আমাদের মতো স্বাভাবিকদের কাছে প্রেরণার। যদি সঠিক মূল্যায়ন হয় তাহলে একদিন তারাও দেশকে অনেক এগিয়ে নিতে পারবে।’

চিটাগং ডিজঅ্যাবেল স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি দিদারুল আলম চৌধুরী। তিনি আবার বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিলেরও সহসভাপতি। শুরু থেকেই তিনি শারীরিক সীমাবদ্ধতার এই তরুণদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। ক্রিকেট সরঞ্জাম থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বাইরে যাতায়াতের খরচও তিনি দেন।

দিদারুল আলম বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই ছেলেরা এগিয়ে যাচ্ছে। তারা যদি আরও পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রশিক্ষণ পায় তাহলে অনেক বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারবে।

ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ক্রিকেটে কিছু ভিন্ন নিয়মও রয়েছে। তিন ক্যাটাগরির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর মধ্যে বি-১ যারা, অর্থাৎ যারা একেবারেই দেখে না, তারা ১ রান নিলে সেটা ২ রান হিসাব করা হয়। বি-২ এবং বি-৩ ক্যাটাগরির যারা, তাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রিকেটের সঙ্গে কোনো হেরফের নেই। এ ছাড়া বলটি বিশেষায়িত—এই বলের ভেতরে এক ধরনের বস্তু থাকে, ক্রিজে কিংবা মাটিতে পড়লে ‘ঝুনঝুন’ শ­ব্দ হয়। এই শব্দে খেলোয়াড় ধারণা করে বলের গতিবিধি। এসব নিয়ম মেনেই এই তরুণেরা তাদের অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন তাদের দেশের জন্য কিছু করা, পাশাপাশি নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category