,

তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড (ফাইল ফটো)

১০৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন পাঁচজন

ডেক্স নিউজ: চার বছর আগে আজকের এই দিনেই ঘটে  আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এতে নিহত হন ১১২ জন শ্রমিক।

অগ্নিকাণ্ডের চার বছর পার হলেও ধীর গতিতে চলছে মামলার কার্যক্রম। ঘটনার পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম বাদী হলে একটি মামলা করেন। মামলায় ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টা জানান, সাক্ষী না আসায় মামলাটির বিচার চার বছরেও শেষ হয়নি। অনেকটা ধীরগতিতেই চলছে মামলার কার্যক্রম। আদালতে সাক্ষী হাজির না হওয়াই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মামলার সুবিচার হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এ মামলার অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলাটিতে মোট ১০৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন আদালত।

চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি এ মামলার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই দিন মামলার বাদি এসআই খায়রুল ইসলাম ও মামলা রেকর্ড অফিসার এসআই মো. শাহ জালাল মিয়া আদালতে সাক্ষ্যপ্রদান করেন। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি সোনা মিয়া নামের এক পথচারী ও ১০ এপ্রিল গার্মেন্টস অপারেটর মো. শাল আলম ও লাইলী বেগম সাক্ষ্য দেন। এরপর আর কোনো সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি।

আদালত সাক্ষীদের প্রতি অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওই দিনও আদালতে কোনো সাক্ষী না আসায় বরাবরের মতোই রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্যগ্রহণ পেছানোর জন্য সময়ের আবেদন করেন। সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে আগমী ২৯ জানুয়ারি পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ এস এম সাইফুল ইসলাম।

অপরদিকে চার্জশিটভুক্ত মোট ১৩ জন আসামির মধ্যে ১১ জনই বর্তমানে জামিনে আছেন। এর মধ্যে দুজন জামিন নিয়ে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। বাকি দুই আসামি পলাতক রয়েছেন।

জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন, ‘মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। পাঁচজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যেই পাঁচজন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে তাদের প্রতি সমন দেওয়া আছে। হয় তারা আসবে, আর তা না হলে তাদেরকে আদালতে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। পরবর্তী সময় আমরা আরো দ্রুত আদালতে সাক্ষীদের উপস্থাপনের চেষ্টা করব।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘দেখতে দেখতে ঘটনার চার বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুনি দেলোয়ারের (প্রতিষ্ঠানের মালিক) বিচার হলো না, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, অগ্নিকাণ্ডে ১১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আর যারা আহত হয়েছেন তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। ওই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেও ‘মালিকের অবহেলা জনিত কারণ’ সামনে এসেছে। এরপরও কেন বিচার হল না? আমরা সরকারের কাছে এর জবাব চাই। এটা শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী একটা অবস্থা ও চূড়ান্তভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। দেলোয়ারের বিচার না হলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। আর এসব কারণেই মালিকেরা আইন-কানুনের তোয়াক্কা করে না। কারণ তারা জানে, অপরাধ করলেও তাদের কোনো বিচার হবে না।’

মামলার সাক্ষীদের নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এগুলো  সাজানো ঘটনা। কাদের সাক্ষী করা হয়েছে? পুলিশ তাদের কোনো হদিসই দিচ্ছে না। ওই এলাকার মানুষ ও ওই কারখানায় যে সমস্ত শ্রমিকেরা কাজ করছিল তাদের সাক্ষী করা উচিত ছিল। এখন সাক্ষীদের পুলিশ হাজির করে না। সবকিছু মিলিয়ে খুনি দেলোয়ারকে বাঁচানোর জন্য একটা তৎপরতা চলছে। এর সমস্ত দায় সরকারকে নিতে হবে।’

মামলার আসামিরা হলেন- তাজরীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার মিতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. দুলাল উদ্দিন, স্টোর ইনচার্জ মো. হামিদুল ইসলাম লাভলু, মো. আল আমিন, মো. আনিসুর রহমান, লোডার মো. রানা ওরফে আনারুল (জামিন নিয়ে পলাতক), মো. আল আমিন-২, মো. শামিম মিয়া (জামিন নিয়ে পলাতক), প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল মোর্শেদ, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার মো. আব্দুল রাজ্জাক, কোয়ালিটি ম্যানেজার মো. শহিদুজ্জামান দুলাল (পলাতক) ও প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জু (পলাতক)।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ১১২ জন পোশাকশ্রমিক নিহত হন। আহত হন ১০৪ জন শ্রমিক। গার্মেন্টসটিতে এক হাজার ১৬৩ জন শ্রমিক কাজ করতেন। দুর্ঘটনার সময় ৯৮৪ জন শ্রমিক সেখানে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনায় ৫৪ জনের লাশ শনাক্ত না হওয়ায় তাদের অশনাক্ত অবস্থায় জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ঘটনার পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় নাশকতার পাশাপাশি অবহেলাজনিত মৃত্যুর দণ্ড বিধির ৩০৪(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।

২০১২ সালের ২২ ডিসেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খানা আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। এতে তাজরীনের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

 

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category