,

খোকসার জুবিলী ব্যাংকে ফারুক-রশীদের শেয়ারের সব কার্যক্রম স্থগিত

হোসাইন মোহাম্মদ সাগর, ঢাকাঃ দেশের প্রাচীনতম জুবিলী ব্যাংক লিমিটেডে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ফারুক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রশিদের শেয়ার হস্তান্তর/প্রত্যাহারসহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ পেলেই ব্যাংকটিতে থাকা এ দুই খুনির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

গত ৩ অক্টোবর কয়েকটি দৈনিকে ‘জুবিলী ব্যাংকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শেয়ার!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ‘জুবিলী ব্যাংক লিমিটেডে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (অব.) ফারুক ও কর্নেল(অব.) আব্দুর রশিদের নামে থাকা শেয়ার বাজেয়াপ্তকরণের বিষয়ে মতামত প্রদান’বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত ৭ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। ওই চিঠির উত্তরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব এস এম মাসুদুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিটি ২১ নভেম্বর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আসে।

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত দুই খুনির জুবিলী ব্যাংকের শেয়ার সংক্রান্ত সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ওই চিঠির উত্তরে জুবিলী ব্যাংকে ফারুক-রশিদের শেয়ার সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর কর্তৃক জুবিলী ব্যাংক লিমিটেডে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (অব.) ফারুক ও কর্নেল (অব.) আব্দুর রশিদের নামের শেয়ার হস্তান্তর/প্রত্যাহার সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ এবং দাখিলকৃত রিটার্নসমূহ রেকর্ড করার সব কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে এবং বর্ণিত খুনিদের উক্ত ব্যাংকের সমূদয় শেয়ার বাজেয়াপ্তকরণ বিষয়ে আইনগত পরামর্শ চেয়ে সংশ্লিষ্ট নথি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। উক্ত মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুসারে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

এর আগে ফারুক ও রশিদ কীভাবে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার হলেন তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকটির অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের নামে ব্যাংকের শেয়ার থাকার অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর অপর খুনি মেজর (অব.) বজলুল হুদারও শেয়ার ছিল এই ব্যাংকে। তিনি ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে ব্যাংকটির পরিচালক ছিলেন। ব্যাংকের ১৯৯২ সালের বিবরণীতে তাকে আর পরিচালক উল্লেখ করা হয়নি। তার শেয়ারের কী হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুবিলী ব্যাংক লিমিটেড ১৯১৩ সালে কুষ্টিয়ার খোকসায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশের প্রাচীনতম ব্যাংক। এ ব্যাংকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দেশের কোথাও এর শাখা নেই। ব্যাংকটির একটি ওয়েবসাইট থাকলেও সেখানে তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই। এর আগে ২০১২ সালে একবার অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ব্যাংকটি দখলের চেষ্টাও হয়েছিল।

১৯৯১ সালের ২৩ জানুয়ারি জুবিলী ব্যাংকের দাখিল করা ১৯৯০ সালের বার্ষিক মূলধন বিবরণী অনুযায়ী, এর অনুমোদিত মূলধন ১০ কোটি টাকা, যা ২৫ টাকার মোট ৪০ লাখ শেয়ারে বিভক্ত। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি ফারুক ও আব্দুর রশিদ পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।

সূত্র জানায়, জুবিলী ব্যাংকে ফারুক ও রশিদের নামে ৮৫ হাজার শেয়ার রয়েছে। এগুলো বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকটিতে বিভিন্ন সময়ে কাদের মালিকানা ছিল, পরিচালনা পর্ষদে কারা ছিলেন, খুনিদের শেয়ারের কী অবস্থা- এসব জানানোর জন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়।

সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জুবিলী ব্যাংকের বার্ষিক মূলধন বিবরণী যাচাই করে। তারা জেনেছে, ব্যাংকটিতে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি মেজর (অব.) বজলুল হুদারও শেয়ার আছে।

সূত্র জানায়, আরজেএসসির যাচাই প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের বার্ষিক মূলধনের বিপরীতে মেজর (অব.) বজলুল হুদাকে জুবিলী ব্যাংকের পরিচালক দেখানো হয়। কিন্তু সে সময় তার কী পরিমাণ শেয়ার ছিল তার উল্লেখ নেই। ফারুক ও আব্দুর রশিদের নামে কী পরিমাণ শেয়ার ছিল, তার তথ্যও ব্যাংক থেকে আরজেএসসিকে জানানো হয়নি। ১৯৯২ সালের বিবরণীতে পরিচালকের তালিকায় বজলুল হুদার নাম নেই। এরপর পরিচালকের তালিকায় ঘন ঘন পরিবর্তন এসেছে।

কোম্পানিটি ১৯১৩ সালের ১৫ এপ্রিল ‘খোকসা জানিপুর জুবিলী ব্যাংক লিমিটেড’নামে আরজেএসসিতে নিবন্ধিত হয়। নিবন্ধন নম্বর : সি-২৩৭৩। ১৯৮৭ সালের ২৬ জানুয়ারি নাম পরিবর্তন করে ‘জুবিলী ব্যাংক লিমিটেড’করা হয়। নিবন্ধনের পর থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এটির হিসাব আরজেএসসির রেকর্ডপত্রে নেই। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিসাব আরজেএসসিতে দাখিল করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে সাজা ঘোষণার পাশাপাশি খুনিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন আদালত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জুবিলী ব্যাংকে থাকা দুই খুনির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার জন্য গত ২৯ জুন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত না থাকায় বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে গত ২৬ জুলাই মন্ত্রণালয়কে ফিরতি চিঠি দেয় বিএসইসি। জুবিলী ব্যাংক দেশের কোনো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয়। ফলে ওই সব শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে বিএসইসি।

 

Facebooktwitterlinkedinyoutube
Facebooktwitterredditpinterestlinkedin


     More News Of This Category